স্টাফ রিপোর্টার
গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জাকিয়া সরোয়ার লিমা (পরিচিতি নাম্বার ১৮৯৪৭) এবং তাঁর কার্যালয়ের সহকারী মাহবুবুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং প্রতিবেদনে তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে আসামিকে আড়াল করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, গাজীপুরের পিটিশন মামলা (মামলা নং- ৫৮৪/২২) কেন্দ্র করে সংঘটিত এই দুর্নীতির বিষয়ে প্রতিকার ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর লিখিত আবেদন জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও মামলার বাদী মোঃ আব্দুল কাইয়ুম খান।
অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে আইনি বিধিমালা লঙ্ঘন, আদালত অবমাননা এবং অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ সংগঠনের পলাতক আসামিকে প্রতিবেদন থেকে আইনি সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ও ঘটনাস্থলে হামলা
মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, গাজীপুরের বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের পিটিশন মামলা নং- ৫৮৪/২২-এর সরেজমিন তদন্তের অংশ হিসেবে গত ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে সকাল ১০ ঘটিকায় কালীগঞ্জের মইসার গ্রামে উভয় পক্ষকে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন এসিল্যান্ড জাকিয়া সরোয়ার লিমা বাদীকে ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দেন। নির্দেশ অনুযায়ী মামলার বাদী মোঃ আব্দুল কাইয়ুম খান সকাল ৯:৫০ মিনিটে সরেজমিনে পৌঁছান।
তবে মামলার মূল বিবাদী, গাজীপুর জেলা নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি এবং চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলার পলাতক ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি রোকনুজ্জামান ভূঁইয়া রনি সেখানে অনুপস্থিত ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ই আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে রনি এলাকায় অবস্থান না করলেও, বিবাদী অনুপস্থিত থাকা অবস্থায় তাঁর ক্যাডার বাহিনী বাদী পক্ষের ওপর সকাল ৯:৫০ মিনিটে অতর্কিত হামলা চালায় এবং তাঁদের গাড়ি ভাঙচুরের চেষ্টা চালায়।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাকিয়া সরোয়ার লিমা সকাল ১০:২০ মিনিটে বিলম্ব করে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। স্থানীয়রা এবং বাদী পক্ষ অতর্কিত হামলার বিষয়ে অবহিত করলেও তিনি কোনো আইনি পদক্ষেপ বা ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। সরেজমিন তদন্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ তিনি মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে তড়িঘড়ি শেষ করে চলে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
কাগজপত্র গ্রহণে অনিয়ম ও একতরফা সুবিধা
তদন্তের সময় বাদী পক্ষ জমির মূল দলিল, নামজারি, হালনাগাদ খাজনার রসিদ ও পর্চাসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিতে চাইলে এসিল্যান্ড তা সরকারি নথিতে জমা না নিয়ে "রিসিভ কপি দেওয়া যাবে না, এমনিই দেন" বলে তা গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, মূল বিবাদী অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে শরিফুল ইসলাম ঘাট রতন নামের এক ব্যক্তি মৌখিকভাবে জায়গাটিতে "রাইস মিল ভাড়া দেওয়ার" কথা বলেন। বাদীর অভিযোগ, শরিফুল ইসলাম রতন একজন চিহ্নিত মাদকাসক্ত, মাদক ব্যবসায়ী ও একাধিক চাঁদাবাজি মামলার আসামি। তদন্তকালে রতনের কাছে ওই জমির স্বপক্ষে নামজারি, মালিকানার দলিল কিংবা খাজনার কাগজপত্র চাওয়া হলে তিনি কোনো প্রকার বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হন। কিন্তু এসিল্যান্ড তাঁর মৌখিক বক্তব্যকেই নথিতে গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত করেন।
এসিল্যান্ড অফিসে ঘুষ লেনদেন ও বিকাশ ট্র্যাকিং
অভিযোগের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অংশ হচ্ছে ভূমি অফিসের আর্থিক অনিয়ম ও অনৈতিক লেনদেন। বাদী জানান, মামলার সিদ্ধান্ত নিজেদের পক্ষে নেওয়া এবং অন্যায্য সুযোগ সুবিধার বিনিময়ে এসিল্যান্ড কার্যালয়ের সহকারী মাহবুবুল ইসলাম মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন।
নথির তথ্যানুসারে, ঘটনার পর গত ২০ জুলাই ২০২৬ তারিখে এসিল্যান্ড কার্যালয়ে বাদী মোঃ আব্দুল কাইয়ুম খানের মাধ্যমে সহকারী মাহবুবুল ইসলামকে প্রথমে নগদ ৪০,০০০ (চল্লিশ হাজার) টাকা প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে বিকাশ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আরও ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা নেওয়া হয়। অর্থাৎ, বাদীর কাছ থেকে মোট ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা ঘুষ হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
পরবর্তীতে এ নিয়ে বাদী তীব্র প্রতিবাদ জানালে এবং বিষয়টির ওপর চাপ সৃষ্টি করলে, ঘুষের টাকা নেওয়ার বিষয়টি আড়াল করতে মাহবুবুল ইসলাম বাদীর স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে ২০,০০০ টাকা ফেরত প্রদান করেন। বাকি ৩০,০০০ টাকা এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। সরকারি দপ্তরে এই ধরনের ডিজিটাল বিকাশ লেনদেনের তথ্য ও ঘুষের টাকা লেনদেনের আলামত তদন্তকারী কমিটির তদন্তে বড় ধরনের প্রমাণ হিসেবে উঠে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বন্ধের দিনে স্বজনপ্রীতি ও তদন্তে কারসাজির আলামত
বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের দেওয়া তদন্তের নোটিশে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল ১৬ জুলাই সরেজমিনে তদন্ত সম্পন্ন করার। কিন্তু এর বাইরে গিয়ে পরবর্তী রবিবার অর্থাৎ ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখ সকাল ১০:২৫ মিনিটে বিবাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এনামুল ইসলাম এবং রতনের ছোট ভাই একটি বিশেষ কালো ব্যাগসহ কালীগঞ্জ ভূমি অফিসে এসিল্যান্ডের খাস কামরায় উপস্থিত হন।
মামলার ধার্য তারিখ বা আদালতের নির্ধারিত সময়সূচি ছাড়া বন্ধের দিন বা আলাদা সময়ে অননুমোদিতভাবে বিবাদী পক্ষের লোকজনকে ডেকে খাস কামরায় বৈঠক করা এবং নথিপত্র লেনদেনকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও তাঁর সরকারি সহকারীর দুর্নীতির প্রত্যক্ষ আলামত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বাদী।
মূল মামলায় জালিয়াতি ও অস্তিত্বহীন পক্ষ তৈরি
আদালতে জমা দেওয়া এসিল্যান্ডের তদন্ত প্রতিবেদনে ব্যাপক প্রশাসনিক জালিয়াতি করা হয়েছে বলে অভিযোগে প্রকাশ। পিটিশন মামলায় বিবাদী হিসেবে রোকনুজ্জামান ভূঁইয়া রনির নাম থাকলেও তদন্ত প্রতিবেদনে রুবায়েদ খান নামের এক তৃতীয় ব্যক্তিকে জমির মূল মালিক হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং পলাতক ছাত্রলীগ নেতা রনিকে তাঁর ভাড়াটিয়া হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
অথচ মূল মামলায় রুবায়েদ খান নামের কোনো ব্যক্তি বা পক্ষ অন্তর্ভুক্তই ছিল না। অভিযোগ উঠেছে, বেআইনি অর্থ লেনদেনের বিনিময়ে মামলার ধারা পরিবর্তন করতেই অস্তিত্বহীন রুবায়েদ খানকে প্রতিবেদনে টেনে আনা হয়েছে।
জমির নামজারি ও সীমানা বিশ্লেষণ করে বাদী জানান, রুবায়েদ কবীর খান মামলার বাদীর ছোট বোনের কাছ থেকে জমি ক্রয়ের দাবি করলেও পারিবারিক বৈধ বণ্টননামা অনুযায়ী উক্ত দাগ ও খতিয়ানে কোনো বোনকে সম্পত্তি প্রদান করা হয়নি। এছাড়া রুবায়েদ কবীর খানের দলিলে উল্লেখিত দুটি চৌহদ্দির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ ভূমির বাস্তব অবস্থানের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। এমনকি রুবায়েদ কবীর খানের নামে কোনো নামজারি বা খাজনার রশিদও নেই।
আরও উল্লেখ করা হয়, মামলার আর্জিতে বাদী বা বিবাদী-কোনো পক্ষ হিসেবেই রুবায়েদ কবীর খানের নাম নেই। বৈধ মালিকানার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকা সত্ত্বেও তাকে মালিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া আদালতের আদেশ অনুযায়ী মামলার বিবাদীর কোনো বৈধ ভাড়ার চুক্তিপত্রও নেই। তারপরও আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা করে ভূমিদস্যু বিবাদীকে বৈধ ভাড়াটিয়া হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
বাদীর দাবি, এসব বিষয় থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বিবাদীপক্ষের সঙ্গে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। এছাড়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, সহকারী মাহবুব ইসলাম সংশ্লিষ্ট এসিল্যান্ডের এসিআর (গোপনীয় প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এসিল্যান্ড কার্যালয় থেকে কোনো প্রকার বৈধ নথি, ভূমি অফিসের রেকর্ড বা স্বত্ব যাচাই-বাছাই না করেই বেআইনিভাবে অসৎ উদ্দেশ্যে রুবায়েদ খানকে মালিক হিসেবে দেখানো হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিতর্কিত ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছাত্রলীগ নেতা রোকনুজ্জামান ভূঁইয়া রনিকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া।
অবৈধ দখল ও আদালতের আদেশ অবমাননা
মামলার সারসংক্ষেপে জানা গেছে, বিবাদী রোকনুজ্জামান ভূঁইয়া রনি এলাকায় একজন চিহ্নিত ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত। ২০২২ সালে তিনি গায়ের জোরে বাদীর নিজ খরচে নির্মিত টিনশেড ঘর বেআইনিভাবে দখল করে সেখানে রাইস মিল স্থাপন করেন।
উক্ত সম্পত্তিতে অবৈধ অনুপ্রবেশ, অবকাঠামোগত পরিবর্তন ও শান্তিভঙ্গ রোধে বিজ্ঞ আদালতের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা (Injunction Order) জারি ছিল। সরেজমিনে তদন্তের সময় এই নিষেধাজ্ঞার কপি এসিল্যান্ড জাকিয়া সরোয়ার লিমার নিকট উপস্থাপন করা হলেও তিনি আদালতের আদেশকে তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার দাপট দেখান এবং তা আমলে নেননি।
অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, সহকারী কমিশনার (ভূমি) আওয়ামী রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী হওয়ার সুবাদে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাকে আইনি জটিলতা ও পুলিশি গ্রেপ্তার থেকে বাঁচানোর জন্য এই অসত্য ও জালিয়াতিপূর্ণ প্রতিবেদন তৈরি করেছেন।
উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও বিচার দাবি
সব মিলিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাকিয়া সরোয়ার লিমা এবং তাঁর সহকারী মাহবুবুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণ, আদালতের আদেশ অমান্য, আসামিকে সুবিধা প্রদান এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অসত্য প্রশাসনিক প্রতিবেদন তৈরির অভিযোগটি গাজীপুর জেলা জুড়েই তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
ভুক্তভোগী মোঃ আব্দুল কাইয়ুম খান জানান, একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে যিনি জনগণের আমানত ও ভূমি ব্যবস্থার সততা রক্ষা করবেন, তিনি উল্টো টাকার বিনিময়ে সন্ত্রাসী ও ভুয়া মালিকদের পক্ষে কাজ করেছেন। ঘুষের টাকা বিকাশে লেনদেনের স্পষ্ট প্রমাণ আমার কাছে রয়েছে।
এই ঘটনায় অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সাথে ক্ষমতার অপব্যবহারকারী এসিল্যান্ড জাকিয়া সরোয়ার লিমা ও ঘুষ লেনদেনে জড়িত সহকারী মাহবুবুল ইসলামের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সিনিয়র সচিবের সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।