যেকোনো মূল্যে সাধারণ জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে বলে দলের নেতাকর্মী ও দায়িত্বশীলদের প্রতি কড়া নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
শনিবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে রংপুর বিভাগের নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট জেলার এবং রংপুর জেলা ও মহানগরের দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সভায় সভাপতিত্বকালে তিনি এসব কথা বলেন। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূল পর্যায়ের দলীয় নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে এমন মতবিনিময় ও সাংগঠনিক বৈঠক করছেন প্রধানমন্ত্রী।
শনিবারের এই বিশেষ সভায় তারেক রহমান যেকোনো মূল্যে দেশের সর্বস্তরের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করার ওপর জোর দিয়ে স্পষ্ট নির্দেশ দেন। বক্তব্যকালে তিনি বলেন, সামনে যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। এই নির্বাচনে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করা বা কোনো প্রার্থীর পক্ষে নিরপেক্ষতা লঙ্ঘনের বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকবে না।
এর পাশাপাশি বিগত জাতীয় নির্বাচনে কোথায় কোথায় সাংগঠনিক ভুলত্রুটি বা দুর্বলতা ছিল, সেসব জায়গা থেকে উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণ করে আগামীর রাজনৈতিক পথচলার প্রস্তুত নেওয়ার জন্যও বিএনপি নেতাদের আহ্বান জানান দলের চেয়ারম্যান। সেই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনগুলোতে ঐক্যবদ্ধভাবে আলোচনা করে যাতে একক যোগ্য প্রার্থী বাছাই করা হয়, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বকে বিশেষ দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন তারেক রহমান।
দলকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও বেশি সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী করার দূরদর্শী লক্ষ্য নিয়ে ধারাবাহিকভাবে এমন বিভাগীয় সাংগঠনিক সভা পরিচালনা করছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রায় প্রতি সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এই ধরণের মতবিনিময় সভার আয়োজন করছেন তিনি। দলের দ্রুত ও কার্যকর সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনা প্রদানের পাশাপাশি সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে দেশের আপামর জনগণের প্রতি নেতাকর্মীদের দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীলতার কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন বিএনপি প্রধান।
দলের দায়িত্বশীল সিনিয়র নেতারা জানিয়েছেন, বিএনপির আগামী জাতীয় কাউন্সিলের পূর্বেই তৃণমূলের নেতাদের কাছ থেকে মাঠপর্যায়ের সার্বিক সাংগঠনিক অবস্থা নিবিড়ভাবে জেনে নিচ্ছেন দলপ্রধান। এছাড়া আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে তৃণমূলের শক্তি সুসংগঠিত করার মূল লক্ষ্যেই তিনি সরাসরি এই মতবিনিময় করছেন। অন্যদিকে, বর্তমান সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় জায়গায় রাজনৈতিক নেতাদের পদায়ন ও নিয়োগের ক্ষেত্রে দেশ ও দলের জন্য তাদের অতীতের ত্যাগ ও অবদানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রাজনীতির মাঠে উদ্ভূত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য উদীয়মান তরুণ ও উদীয়মান নেতৃত্বকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের সভায় কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি আসাদুল হাবীব দুলু, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক, শামীম কায়সার লিংকন সংসদ সদস্য এবং বিএনপি নেতা আমিনুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট জেলা ও মহানগরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বৈঠকের বিষয়ে জানান, এটি মূলত একটি নিয়মিত ও ধারাবাহিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার অংশ। তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় সংগঠনকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী রাখতেই নিয়মিত এই মতবিনিময় সভা আহ্বান করছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি স্বয়ং মাঠপর্যায়ের সংগঠনের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন এবং উদ্ভূত যেকোনো সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা প্রদান করছেন।
উক্ত সভায় অংশ নেওয়া গাইবান্ধা-৪ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য শামীম কায়সার লিংকন সভার বিষয়বস্তু সম্পর্কে বলেন, এটি মূলত দলের অভ্যন্তরীণ একটি বড় সাংগঠনিক সভা ছিল। এখানে দলের সার্বিক সাংগঠনিক বিষয়াদি নিয়ে বিস্তারিত কথা হয়েছে। কীভাবে রাজনৈতিক ময়দানে দলকে আরও সুসংগঠিত, ঐক্যবদ্ধ ও গণমুখী রাখা যায়—সেসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বিস্তারিত উল্লেখ করে বলেন, তৃণমূলে বিএনপির নেতারা যাতে নিজেদের মধ্যে আলোচনা-পর্যালোচনা করে প্রতিটি আসনে একক ও সর্বসম্মত প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেন, সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অতীতে যেসব কৌশলগত ভুল হয়েছিল, তা থেকে যথাযথ শিক্ষাসংগ্রহ করে প্রজ্ঞার সাথে প্রার্থী বাছাই করার নির্দেশ এসেছে। কোনো অবস্থাতেই যেন একটি এলাকায় দলের একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
এর আগে গত ১৯ জুলাই রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে রংপুর বিভাগের ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুর জেলার দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে অনুরূপ একটি সফল সাংগঠনিক সভা করেন তারেক রহমান। ধারাবাহিক এসব সভায় দলীয় কোন্দল নিরসনের মাধ্যমে দলকে সুশৃঙ্খল করতে মূল দল এবং বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের যেসব কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, সেসব মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি অবিলম্বে ভেঙে দিয়ে নতুনভাবে পুনর্গঠন করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়। বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোকে আরও শক্তিশালী, আধুনিক ও গতিশীল করতে দল পুনর্গঠন, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বিলুপ্তকরণ এবং জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এমনকি একদম ওয়ার্ড পর্যায়ে নতুন ও উদ্যমী কমিটি গঠনে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে।
মূলত আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক সূচি ঘোষণার আগেই তৃণমূলের সব ধরনের দলীয় পুনর্গঠন কার্যক্রম সম্পূর্ণ শেষ করতে চান বিএনপি চেয়ারম্যান। সেই লক্ষ্যেই তিনি নিয়মিত সময় দিচ্ছেন। এর আগে চলতি জুলাই মাসের শুরুর দিকে ৪ জুলাই শনিবার গুলশান কার্যালয়ে ঢাকা জেলা ও মহানগর দক্ষিণ বিএনপি এবং জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সাথেও পৃথক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।