সদ্য সমাপ্ত ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে অনলাইন ও গণমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার ১১৩টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে। এসব ভুল তথ্যের বড় অংশ বিভিন্ন দল, খেলোয়াড় ও ম্যাচকে ঘিরে ছড়ানো হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্যের শিকার হয়েছে আর্জেন্টিনা। এরপর রয়েছে স্পেন, ব্রাজিল, মিশর ও পর্তুগাল।
খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসিকে ঘিরে। এরপর রয়েছেন লামিনে ইয়ামাল, নেইমার জুনিয়র ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বিশ্বকাপ চলাকালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ছবি ও ভিডিও, ভুয়া মন্তব্য, পুরোনো ছবি-ভিডিও, ভুয়া ফটোকার্ড এবং বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে।
চলতি বছরের ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি শহরের ১৬টি স্টেডিয়ামে। ৪৮ দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই আসরে ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ ৩৯ দিনের প্রতিযোগিতা শেষে ২০ জুলাই (বাংলাদেশ সময়) ফাইনালে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা ও স্পেন। অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলের জয়ে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নেয় স্পেন।
বিশ্বকাপ ঘিরে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ ছিল খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স, দলগুলোর লড়াই, কোচদের কৌশল ও নানা ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে। একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বিষয় নিয়ে অসংখ্য ছবি, ভিডিও, মন্তব্য ও তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। তবে এর বড় একটি অংশ ছিল বিভ্রান্তিকর, বিকৃত কিংবা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
রিউমর স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, শনাক্ত হওয়া ১১৩টি ভুল তথ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫২টি ছিল আর্জেন্টিনাকে ঘিরে। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ তথ্য ছিল দলটির জন্য নেতিবাচক। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা স্পেনকে ঘিরে ২০টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার ৮০ শতাংশ ছিল স্পেনের পক্ষে ইতিবাচক। এছাড়া ব্রাজিলকে নিয়ে ১৬টি, মিশরকে নিয়ে ১৪টি এবং পর্তুগালকে নিয়ে ৭টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।
ইরানকে ঘিরে শনাক্ত হওয়া ৬টি ভুল তথ্যের সবগুলোই ছিল দেশটির পক্ষে। মরক্কোকে নিয়ে ৪টি ভুল তথ্যের মধ্যে অর্ধেক ছিল ইতিবাচক। অন্যদিকে নরওয়ে, ফ্রান্সসহ কয়েকটি দলকে নিয়ে ছড়ানো ভুল তথ্যের কোনোটিই তাদের পক্ষে যায়নি।
খেলোয়াড়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্যের শিকার হয়েছেন লিওনেল মেসি। তাকে নিয়ে ২২টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার ৬৪ শতাংশ ছিল তার বিপক্ষে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা লামিনে ইয়ামালকে নিয়ে ১১টি ভুল তথ্য পাওয়া গেছে, যার ৮২ শতাংশ ছিল ইতিবাচক। এছাড়া নেইমার জুনিয়রকে নিয়ে ৮টি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে নিয়ে ৬টি এবং আর্লিং হালান্ডকে নিয়ে ৩টি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে।
এছাড়া কিলিয়ান এমবাপে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, ভার্জিল ভ্যান ডাইক, টনি ক্রুস, জুড বেলিংহামসহ আরও কয়েকজন খেলোয়াড়কে ঘিরেও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়েছে। কোচ ও কর্মকর্তাদের নিয়েও ভুল তথ্য প্রচারের ঘটনা ঘটেছে।
রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিশ্বকাপ সংশ্লিষ্ট ২২টি ঘটনায় বাংলাদেশের ৭৮টি গণমাধ্যম মোট ১৪৩টি ভুল প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিশ্বকাপকে ঘিরে ভুল তথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকার বিষয়টিও এতে উঠে এসেছে।
বিশ্বকাপের ম্যাচভিত্তিক বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে আর্জেন্টিনা-স্পেন ফাইনালকে ঘিরে। এই ম্যাচকে কেন্দ্র করে ২২টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচ, যাকে ঘিরে ২০টি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে।
বিশ্বকাপ চলাকালে মাঠের ভেতরের ঘটনা নিয়েও ১৬টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে ৭টি এবং সার্কাজমভিত্তিক ৭টি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়ানো হয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, বিশ্বকাপের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও বাংলাদেশকে যুক্ত করে ২১টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ৩৩টি ভুয়া ছবি ও ভিডিও শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো ছবি ও ভিডিও নতুন ঘটনার দাবি করে ১৭টি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়ানোর ঘটনাও পাওয়া গেছে।
বিশ্বকাপ চলাকালে বিভিন্ন ব্যক্তি ও পরিচিত মুখের নামে মোট ৩৮টি ভুয়া মন্তব্য ছড়ানো হয়েছে। এতে বাংলাদেশের ৬ জনসহ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ১৩ জন খেলোয়াড় ও আরও কয়েকজন ব্যক্তিকে জড়ানো হয়েছে।
রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণ বলছে, বিশ্বকাপের মতো বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য যাচাই ছাড়া কোনো কনটেন্ট প্রচার করলে বিভ্রান্তি বাড়তে পারে। তাই ছবি, ভিডিও, মন্তব্য কিংবা সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।