ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান ডিএমপির ৩ সহকারী পুলিশ কমিশনারকে নতুন পদে বদলি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছাড়াল ১০৭ ডলার হরমুজে নতুন নৌপথ: ওমানের আঞ্চলিক বৈঠক স্থগিত দেশে ফিরে ইতালিতে হামলার বিরুদ্ধে মুখ খুললেন অভিনেত্রী বাঁধন ব্রিকসে বিশ্বনেতাদের দেওয়া হলো নিরামিষ খাবার: বিজেপি-কংগ্রেস তুমুল বিতর্ক সারাদেশে ঘরে ঘরে জ্বর: ডেঙ্গু ও হামের সঙ্গে বাড়ছে টাইফয়েড ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলেই কি থামবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ? ‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে

এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ, সহসাই কাটছে না গ্যাস সংকট


  • আপলোড সময় : বুধবার ২৯ জুলাই, ২০২৬ সময় : ১০:৪৭ এএম

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দেশে চলমান গ্যাস সংকট দ্রুত কাটার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় আবাসিক, শিল্প ও পরিবহন—সব খাতেই এর প্রভাব পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, টার্মিনালটির মেরামতকাজ চললেও চলতি মাসের মধ্যে এটি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে দেশের বিদ্যমান গ্যাস সংকট আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকবে।

গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে অবস্থিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর থেকেই টার্মিনালটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। দেশের জ্বালানি খাতে এই ঘাটতি ইতোমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি পুনঃবাষ্পীভবনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃবাষ্পীভবন ইউনিট (এফএসআরইউ) রয়েছে। দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত সরবরাহ সক্ষমতা দৈনিক এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। তবে একটি টার্মিনাল অচল হয়ে পড়ায় সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, টার্মিনালের বয়লার থেকে বের হওয়া সিগন্যালবাহী বৈদ্যুতিক তারে শর্টসার্কিটের কারণে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। ইতোমধ্যে বিদেশি প্রকৌশলীরা মেরামতের কাজ শুরু করেছেন। তবে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বিবেচনায় দ্রুত টার্মিনাল চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক অবস্থায় সরবরাহ করা হয় প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে আসে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় সরবরাহ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে। ফলে দৈনিক চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি বেড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় সাময়িক এই সংকট তৈরি হয়েছে। টার্মিনালের মেরামতকাজ চলছে। তবে চলতি মাসের মধ্যে এটি সচল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সম্পূর্ণ মেরামত শেষ হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অনেক বাসায় গ্যাসের চাপ থাকে না। ফলে নিয়মিত রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছে অথবা গভীর রাতে গ্যাস এলে তখন রান্না করছে।

রাজধানীর মগবাজারের বাসিন্দা পারভীন জানান, দিনের অধিকাংশ সময় চুলায় গ্যাস থাকে না। এতে পরিবারের খাবার প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মো. সুমন বলেন, গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে একটি রান্না শেষ করতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে।

গ্যাসের সংকটের কারণে অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডার গ্যাস ও ইনডাকশন চুলা ব্যবহার শুরু করেছে। এতে একদিকে আবাসিক গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানির জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।

তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান জানান, তিতাসের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বর্তমানে তারা মাত্র ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাচ্ছেন। টার্মিনাল চালু না হওয়া পর্যন্ত এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না।

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। অনেক স্টেশনে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় নির্ধারিত পরিমাণে জ্বালানি দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।

মগবাজারের একটি সিএনজি স্টেশনে অপেক্ষমাণ চালক মো. আল আমিন বলেন, এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে ঘুরেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও গ্যাস নেই, আবার কোথাও চাপ এত কম যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আরেক চালক মো. কাউছার বলেন, প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস না পাওয়ায় প্রতিদিনের ট্রিপ কমাতে হচ্ছে। এতে আয়ও কমে যাচ্ছে।

জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে এমন সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। তারা দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে। দেশে গ্যাসের সম্ভাবনা থাকলেও পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও উৎপাদনের পরিবর্তে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। সরকার নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে, তবে এ ধরনের উদ্যোগ আরও আগে নেওয়া হলে বর্তমান সংকট অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব হতো।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের বিকল্প নেই। অন্যথায় ভবিষ্যতেও এ ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসতে পারে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর