নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশে
বিমান ও হেলিকপ্টারে ব্যবহৃত
এভিয়েশন জেট ফুয়েলে ভেজালের প্রমাণ পাওয়া গেছে পরীক্ষাগারে। সাম্প্রতিক এক পরীক্ষায় জেট-এ১ জ্বালানির একাধিক
নমুনায় গ্রহণযোগ্য মাত্রার বাইরে পানি ও এসিডের উপস্থিতি
শনাক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের জ্বালানি
ব্যবহার উড্ডয়নের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদে ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশে
বিমান ও হেলিকপ্টারে ব্যবহৃত
এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল (জেট-এ১) সরবরাহ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীন প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড।
সম্প্রতি
প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড
টেকনোলজি (এমআইএসটি) আর্মি এভিয়েশন ও বিজিবির ব্যবহৃত
জেট ফুয়েলের ১৭টি নমুনা পরীক্ষা করে। এর মধ্যে আর্মি
এভিয়েশনের ১৩টি এবং বিজিবির হেলিকপ্টারে ব্যবহৃত চারটি নমুনা ছিল। পরীক্ষার ফলাফলে সব নমুনাতেই গ্রহণযোগ্য
সীমার বাইরে পানি ও এসিডের উপস্থিতি
ধরা পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের
মতে, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী জেট-এ১ জ্বালানিতে পানির
উপস্থিতি কার্যত শূন্য থাকার কথা। কিন্তু পরীক্ষায় প্রতি মিলিয়ন অংশে (পিপিএম) প্রায় ৫০ পিপিএম পানি
পাওয়া গেছে। একইভাবে এসিডের উপস্থিতিও শূন্য হওয়ার কথা থাকলেও প্রতি কেজি জ্বালানিতে ০.৫ মাইক্রোগ্রাম
কেএইচ (KOH) ইউনিট এসিড শনাক্ত হয়েছে, যা নিরাপদ মাত্রার
বাইরে।
এমআইএসটির
অধ্যাপক ড. মো. আমিরুল
ইসলাম বলেন, জেট-এ১ জ্বালানিতে পানি
ও এসিডের উপস্থিতি ইঞ্জিনের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এতে ইঞ্জিনের ঘূর্ণনগতি (আরপিএম) কমে যেতে পারে এবং উড্ডয়নের সময় ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
তিনি
জানান, একটি উড়োজাহাজের ইঞ্জিন প্রায় ৩০ হাজার আরপিএম
গতিতে ঘোরে। এত উচ্চগতিতে চলা
ইঞ্জিনে যথাযথ লুব্রিকেশন নিশ্চিত না হলে দ্রুত
যান্ত্রিক ক্ষয় শুরু হতে পারে। জ্বালানিতে থাকা পানি ও এসিড দহনের
সময় লুব্রিকেটিং অয়েলের সঙ্গে মিশে ইঞ্জিন অয়েল দূষিত করে ফেলতে পারে। এর ফলে ইঞ্জিনের
কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ড.
মো. আমিরুল ইসলাম আরও বলেন, দেশে অতীতে সংঘটিত কয়েকটি প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনার পেছনেও জ্বালানির মানগত সমস্যা ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত
সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রতিটি দুর্ঘটনার পৃথক তদন্ত প্রয়োজন।
বিমান
বাহিনীর সাবেক উইং কমান্ডার এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, বিমানের জ্বালানির মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব মূলত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের। জ্বালানি পরিবহনের পুরো প্রক্রিয়ায় মান নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত
করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবহারকারী সংস্থাগুলো সাধারণত জ্বালানি গ্রহণের সময় সরবরাহকারীর দেওয়া পরীক্ষার সনদ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
যাচাই করেই জ্বালানি গ্রহণ করে থাকে।
এদিকে
অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড কর্তৃপক্ষ। তবে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নির্ধারিত মান অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করার পরই তারা জেট ফুয়েল সরবরাহ করেন।
তার
ভাষ্য, সরবরাহের পর জ্বালানির সংরক্ষণ,
পরিবহন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব
সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায়। তিনি বলেন, বিমান বাহিনী তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জ্বালানি নিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে সংরক্ষণ বা ব্যবহারের সময়
কোনো পরিবর্তন বা দূষণ ঘটলে
সেটি ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানের বিষয়। প্রয়োজনে উভয় পক্ষের সংরক্ষিত নমুনা পুনরায় পরীক্ষা করা যেতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জ্বালানি
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের বিমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেট ফুয়েলের গুণগত মান যাচাই, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায়
আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের
মাধ্যমে পরীক্ষার ফলাফল যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। তাদের মতে, উড্ডয়ন নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো ধরনের অবহেলার সুযোগ নেই।