ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান ডিএমপির ৩ সহকারী পুলিশ কমিশনারকে নতুন পদে বদলি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছাড়াল ১০৭ ডলার হরমুজে নতুন নৌপথ: ওমানের আঞ্চলিক বৈঠক স্থগিত দেশে ফিরে ইতালিতে হামলার বিরুদ্ধে মুখ খুললেন অভিনেত্রী বাঁধন ব্রিকসে বিশ্বনেতাদের দেওয়া হলো নিরামিষ খাবার: বিজেপি-কংগ্রেস তুমুল বিতর্ক সারাদেশে ঘরে ঘরে জ্বর: ডেঙ্গু ও হামের সঙ্গে বাড়ছে টাইফয়েড ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলেই কি থামবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ? ‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে

দারিদ্র্য ও সহিংসতার বলি: নারীদের যৌন পেশায় আসার কারণ প্রকাশ


  • আপলোড সময় : শনিবার ০১ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ১১:০০ এএম

বাংলাদেশের পথভিত্তিক নারী যৌনকর্মীদের জীবন সংগ্রাম ও এই পেশায় যুক্ত হওয়ার নেপথ্য করুণ বাস্তবতার এক চাঞ্চল্যকর সামাজিক চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। গবেষণায় উঠে এসেছে যে, পথচলতি এসব নারীদের কেউই প্রকৃতপক্ষে স্বপ্রণোদিত হয়ে বা নিজেদের ইচ্ছায় এই অনিশ্চিত জীবনে পা বাড়াননি। বরং শৈশবকালের চরম ও নির্মম দারিদ্র্য, পারিবারিক সুরক্ষার ভাঙন, অপ্রাপ্তবয়সে গৃহত্যাগ এবং পাশবিক শারীরিক সহিংসতার শিকার হওয়া—এই মূলত চারটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ট্র্যাজেডিই তাঁদের বাধ্য করেছে এমন ঝুঁকিপূর্ণ জীবন বেছে নিতে। গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় সব নারীর জীবনেই উক্ত চার অভিজ্ঞতার অশুভ মেলবন্ধন দেখা গেছে, যা স্পষ্ট প্রমাণ করে যে এটি একক কোনো ব্যক্তির নিজস্ব সিদ্ধান্ত বা চরিত্রগত বিষয় নয়, বরং সমাজের একটি গভীর কাঠামোগত সংকট।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একাডেমিক সাময়িকী ‘কালচার অ্যান্ড সাইকোলজি’-তে সম্প্রতি 'বিয়ন্ড রিডেম্পশন: প্রিভেনশন, প্রটেকশন অ্যান্ড ন্যারেটিভ আইডেন্টিটি কনস্ট্রাকশন এমং বাংলাদেশি স্ট্রিট বেজড ফিমেল সেক্স ওয়ার্কার্স' শিরোনামে এই বিশেষ গবেষণাটি আত্মপ্রকাশ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার বিশেষ কেন্দ্র ‘মাইন্ডওয়েল রিসার্চ ল্যাব’-এর অধীনে এই গুরুত্বপূর্ণ জরিপ চালনা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ডক্টর মো. আজহারুল ইসলামের প্রত্যক্ষ সার্বিক নেতৃত্বে চারজন দক্ষ বিশেষজ্ঞ গবেষকের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক দল এই বিস্তৃত গবেষণা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেন।

গবেষণায় দেশের বিভিন্ন শহরাঞ্চলের আঠারো থেকে পঁতাল্লিশ বছর বয়সী প্রায় ত্রিশ জন পথভিত্তিক নারী যৌনকর্মীর প্রাত্যহিক জীবনসংগ্রাম, ব্যক্তিগত দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ইতিহাস ও মনস্তাত্ত্বিক ভাঙাগড়ার গতিপ্রকৃতি বৈজ্ঞানিক উপায়ে বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণালব্ধ ফলাফলে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অন্তত ৯৩ শতাংশ নারী উক্ত পেশায় যুক্ত হওয়ার আগেই নিজ নিজ জীবনে চরম শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। এ ছাড়া অন্তত ৬৭ শতাংশ নারী শৈশব কিংবা কৈশোরে পারিবারিক কিংবা সামাজিক চাপের মুখে বাধ্য হয়ে নিজেদের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়স্থল বা বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, পথভিত্তিক এই পেশা তাঁদের কারোরই স্বপ্নের কোনো মাধ্যম ছিল না। বরং বারবার পারিবারিক নির্যাতন, চরম অর্থনৈতিক অনটন ও আত্মরক্ষামূলক আশ্রয়ের চরম অভাবে কেবল বেঁচে থাকার শেষতম খড়কুটো হিসেবে তাঁরা বাধ্য হয়ে এই পথে পা বাড়িয়েছিলেন। গবেষণায় নিজের শৈশবের রোমহর্ষক স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এক ভুক্তভোগী নারী জানান, মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি তিন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দ্বারা গণপৈশাচিকতার শিকার হন, সেই সময় রক্তক্ষরণে ছটফট করলেও সামাজিকভাবে কেউ তাঁকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়নি। একইভাবে অন্য এক নারী জীবিকার খোঁজে রাজধানীতে এসে প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে কীভাবে জোরপূর্বক অন্ধকার জগতে বন্দি হয়েছিলেন, তার বিবরণ দেন।

গবেষণার প্রধান সমন্বয়ক ডক্টর আজহারুল ইসলাম জানান, গবেষণাভুক্ত ত্রিশ জনের একজনও স্বেচ্ছায় এ পেশায় আসেননি। প্রত্যেকের জীবনের গল্পে দারিদ্র্য, পরিবার ভেঙে যাওয়া, বাস্তুচ্যুত হওয়া ও নির্যাতনের একটি সাধারণ ছক রয়েছে। তিনি আরও গুরুত্বারোপ করেন যে, অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে সংকট তৈরির পূর্বেই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে সমন্বিত প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া আবশ্যক।


এ সম্পর্কিত আরো খবর