আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল ভিত্তি শিল্পায়ন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়নে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী শ্রেণির ভূমিকা নিঃসন্দেহে অপরিসীম। তবে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ইতিহাসের পাতা উল্টালে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও বিভ্রান্তিকর ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার পূর্বে পাকিস্তান আমলে দেশের পুরো অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণকারী তথাকথিত "২২ পরিবার" শিল্পপতির কথা ব্যাপকভাবে চর্চিত হতো। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার করে আজ সেই সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে আনুমানিক "২২০০ পরিবারে" উন্নীত হয়েছে। সংখ্যাগত দিক থেকে এই বিপুল বিস্তার ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু এদেশের অধিকাংশ শিল্পপতির উত্থান ও বিকাশ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে সবসময়ই তীব্র প্রশ্ন ও ক্ষোভ থেকে গেছে।
এক বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এদেশের বেশিরভাগ স্বঘোষিত শিল্পপতির ধনকুবের হয়ে ওঠার পথটি প্রায় অভিন্ন। মূলত তিনটি প্রধান অনৈতিক ও অবৈধ পন্থ অবলম্বন করে তাদের এই সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে:
১. ব্যাংক লুট ও ঋণ খেলাপি: সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বিপুল পরিমাণ ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে সেই ঋণ পরিশোধ না করে কৌশলগতভাবে খেলাপিতে পরিণত হওয়া এখানকার নিয়মিত চিত্র। রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক সুরক্ষার কারণে এই ঋণের সিংহভাগ টাকাই আর ব্যাংকে ফেরত আসে না। ফলে কোটি কোটি সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা লুট হয়ে নির্দিষ্ট কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির পকেটে চলে যায়।
২. ভূমিদস্যুতা ও জমি দখল: দেশের সরকারি খাস জমি, নদীর প্রাকৃতি সীমানা, উর্বর কৃষি জমি এবং সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের রক্তের দামে কেনা জমি বেআইনিভাবে দখল করে বালু ভরাটের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। পরবর্তীতে সেসব জায়গায় গড়ে তোলা হয় বিশাল আবাসন প্রকল্প, শিল্প কারখানা বা বাণিজ্যিক ভবন। কোনো ভুক্তভোগী যদি এই দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে যান, তবে তাকে হত্যা মামলা, শারীরিক হামলা ও নানা প্রশাসনিক হয়রানির শিকার হতে হয়।
৩. দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা: সরকারি বড় বড় কাজের টেন্ডারবাজি, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাৎ, কর ফাঁকি এবং শুল্ক ফাঁকির মাধ্যমে রাতের আঁধারে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই পুরো প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নীরব সমর্থন ও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা লক্ষ্য করা যায়। অতীতেও যেমন এই ধারা বিদ্যমান ছিল, বর্তমানেও তা একইভাবে অব্যাহত রয়েছে; যা স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
কেস স্টাডি: আসিয়ান গ্রুপ
এই ধারাবাহিক অনিয়মের একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি আলোচনায় উঠে এসেছে 'আসিয়ান গ্রুপ'। গ্রুপটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর ও বিস্ফোরক অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় তথ্য ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, তিনি একসময় অত্যন্ত সাধারণভাবে মাছ বিক্রি করে জীবনধারণ করতেন। কিন্তু আজ তিনি হাজার কোটি টাকার বিশাল সম্পদের মালিক। বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তার অবৈধ সম্পদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের কাছ থেকে প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে তা আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া সাধারণ মানুষের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি জোরপূর্বক দখল ও বালু ভরাট করে "আসিয়ান সিটি" নামক আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক আশ্রয়ের ক্ষেত্রেও তিনি সমান চতুর; অতীতে একটি রাজনৈতিক দলের থানা পর্যায়ের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদকের পদে থাকলেও বর্তমানে তিনি নতুন প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির ছত্রছায়ায় সুরক্ষা পাচ্ছেন বলে জানা যায়।
বিচারব্যবস্থা ও জবাবদিহিতার সংকট
সম্প্রতি আসিয়ান গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে একজন নারী মডেলের সাথে ঘটে যাওয়া একটি ন্যক্কারজনক ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়। অভিযোগকারী ওই মডেলের বক্তব্য অনুযায়ী, উক্ত কার্যালয়ে তিনি চরম শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনার শিকার হন। অথচ এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে জামিন লাভ করতে সক্ষম হন।
এই ধরনের ঘটনা দেশের বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর তালিকায় বিচারব্যবস্থার অবস্থান তৃতীয়। যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, অর্থ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রায়শই আসল তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। যদিও এর মাঝেও এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আমাদের বিচার বিভাগে এখনও বেশ কিছু সততা, নিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতায় অটল বিচারক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
উত্তরণের পথ ও সুপারিশমালা:
দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অবিলম্বে নিমোক্ত জরুরি পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন: ১. স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত: আসিয়ান গ্রুপের বিরুদ্ধে আনীত সকল আর্থিক অনিয়ম, জমি দখল এবং সাম্প্রতিক ফৌজদারি ঘটনার নিরপেক্ষতার স্বার্থে একটি জুডিশিয়াল (বিচারবিভাগীয়) তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে।
২. সম্পদের হিসাব গ্রহণ: অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তার স্বনামীয়-বেনামী প্রতিষ্ঠানের আয়কর ফাইল পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করতে হবে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তাদের সমস্ত সম্পদের বৈধ উৎস দেশবাসীর সামনে প্রকাশ্যে আনতে হবে।
৩. ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ: নিরপেক্ষ তদন্তে অবৈধভাবে জমি দখল ও অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেলে, অভিযুক্তের সেসব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে প্রকৃত ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।
৪. ঋণ খেলাপিদের রাজনৈতিক সুরক্ষা বন্ধ: ব্যাংক লুট ও বড় বড় ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে এবং তাদের সব ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশয় চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
টেকসই ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার জন্য শিল্পায়নের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু দুর্নীতি, ভূমিদস্যুতা ও ব্যাংক লুটের উপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠা শিল্প কখনো দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। পাকিস্তান আমলের "২২ পরিবার" থেকে আজ "২২০০ পরিবারে"র উত্থান ঘটলেও, সেই উত্থানের ভিত্তি যদি হয় শোষণ ও জুলুম—তবে তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য চরম বিপদ ডেকে আনবে। অবিলম্বে সর্বস্তরে জবাবদিহিতা, মেধা এবং আইনের শাসন সুনিশ্চিত করাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।