রূপগঞ্জ( নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি
শফিকুল আলম ভূঁইয়া, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি:
"বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িত গেলাম, দেখা পাইলাম না..."—একসময়ের জনপ্রিয় গানের সেই গভীর আকুতি কিংবা প্রিয় বন্ধুর চিঠির জন্য ডাকপিয়নের পথ চেয়ে বসে থাকার দিনগুলো এখন শুধুই ইতিহাস। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বন্ধুত্বের ধরন ও সম্পর্কের সমীকরণে এসেছে আমূল পরিবর্তন। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা দূরকে কাছে আনলেও মানুষের অন্তরের মধ্যকার হৃদ্যতা ও স্পর্শকে যেন যান্ত্রিক করে তুলেছে।
ষাঠোর্ধ্ব স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের সময় বন্ধুর জন্য জীবন বাজি রাখার মানসিকতা ছিল। এক বন্ধুর অসুখ হলে সবাই দলবেঁধে দেখতে যেতাম। আর এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা স্ট্যাটাস দিয়েই দায়িত্ব শেষ! ১০ জন বন্ধু একসাথে বসলেও কথা হয় না, সবার চোখ থাকে মোবাইলের পর্দায়। আড্ডার সেই সুখ-দুঃখের রূপকথা এখন স্মার্টফোনের নিচে চাপা পড়েছে।”
নব্বইয়ের দশকেও বিকেল হলেই গলির মোড়ে বা খেলার মাঠে বন্ধুদের পদচারণায় মুখরিত থাকত চারপাশ। ভুল বোঝাবুঝি হলে এখনকার মতো ‘ব্লক’ বা ‘আনফলো’ করার সুযোগ ছিল না; মন কষাকষি মেটাতে মুখোমুখি দাঁড়াতেই হতো। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া সংযুক্তির ফলে সেই চিত্র বদলে গিয়ে ভার্চুয়াল মেসেজিং, রিলস শেয়ারিং আর অ্যালগরিদমের কৃত্রিমতায় বন্দি হয়েছে।
অনলাইন প্রোফাইলে শত শত বা হাজারো বন্ধু থাকলেও বাস্তব জীবনের সংকটে পাশে পাওয়ার মতো অকৃত্রিম মানুষের তীব্র অভাব দেখা দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিশ্বজুড়ে বৃদ্ধি পাওয়া এই একাকীত্বকে গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক ও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকার এই প্রবণতা প্রতিদিন ১৫টি সিগারেট খাওয়ার মতোই শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
অবশ্য প্রযুক্তির সবটুকুই নেতিবাচক নয়। ভৌগোলিক সীমারেখা ছাপিয়ে হাজার মাইল দূরে থাকা বন্ধুর সাথে নিমেষেই ভিডিও কলে যুক্ত থাকা বা পুরনো বন্ধুকে হঠাৎ খুঁজে পাওয়ার সুবিধা দিচ্ছে এই প্রযুক্তি।
স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক পরামর্শ নিয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক সার্জন ডা. অরূপ রতন শাহা জানান, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি করছে এবং একাকীত্ব বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, “যুগের প্রয়োজনে প্রযুক্তি লাগবে, তবে তার অপব্যবহার রোধ করতে হবে। বন্ধুদের সাথে সরাসরি প্রাণখুলে কথা বলা, খেলাধুলা করা এবং বাচ্চাদের মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।”