বিনোদন ডেস্ক
ভারতীয় সিনেমার প্রথম সারির নারী সুপারস্টারদের কথা উঠলে সবার আগে যে নামগুলো ভেসে ওঠে, তার মধ্যে অন্যতম মহাতারকা শ্রীদেবী। অভিনয়, নাচ, অনবদ্য সৌন্দর্য ও বহুমুখী প্রতিভায় তিনি নিজেকে এমন এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন, যার কারণে ৯০-এর দশকে তাঁকে আখ্যা দেওয়া হতো ‘ফিমেল অমিতাভ বচ্চন’।
২০১৮ সালে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে শ্রীদেবীর আকস্মিক মৃত্যু ভারতীয় চলচ্চিত্রে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে। তবে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি যে সাফল্য, খ্যাতি ও বিপুল সম্পদ রেখে গেছেন, তা আজও তাঁকে রূপালী জগতের ইতিহাসে আলাদা ও অনন্য করে রাখে।
১৯৬৭ সালে তামিল পৌরাণিক সিনেমা ‘কন্ধন করুণাই’-এ মাত্র চার বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ে অভিষেক হয় শ্রীদেবীর। ১৯৭৫ সালে ‘জুলি’ সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবেই হিন্দি চলচ্চিত্রে পা রাখেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে ১৩ বছর বয়সে তামিল সিনেমা ‘মুন্দ্রু মুদিচু’-তে প্রথমবার নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করে চমক সৃষ্টি করেন। ১৯৭৯ সালে ‘সোলভা সাওয়ান’ দিয়ে হিন্দি সিনেমায় মূল নায়িকা হিসেবে যাত্রা শুরু করার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। হিন্দি, তামিল, তেলেগু ও মালয়ালম—চার প্রধান ভাষার তিন শতাধিক ছবিতে অভিনয় করে ভারতীয় সিনেমার একচ্ছত্র রানি হয়ে ওঠেন তিনি।
বর্তমানে চলচ্চিত্রে অভিনয়শিল্পীদের পারিশ্রমিকের বৈষম্য নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও, ৯০-এর দশকেই শ্রীদেবী নারী অভিনেত্রীদের পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন। ১৯৯৩ সালের ‘রূপ কি রানি চোরো কা রাজা’ সিনেমার জন্য তিনি ১ কোটি রুপি পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন, যা সে সময় কোনো নারী অভিনেত্রীর জন্য ছিল সম্পূর্ণ নজিরবিহীন। একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ওই সময়ে দক্ষিণ ভারতীয় সুপারস্টার চিরঞ্জীবীও প্রায় একই পরিমাণ পারিশ্রমিক নিতেন। এমনকি নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময় অমিতাভ বচ্চন ও কমল হাসান যখন পারিশ্রমিক বাড়াতে শুরু করেন, তখন শ্রীদেবী তাঁদের চেয়েও বেশি পারিশ্রমিক দাবি করতেন বলে জানা যায়।
‘লামহে’ (১৯৯১), ‘খুদা গওয়াহ’ (১৯৯২), ‘গুমরাহ’ (১৯৯৩), ‘লাডলা’ (১৯৯৪) ও ‘জুদাই’ (১৯৯৭)-এর মতো একের পর এক সুপারহিট ও সফল সিনেমা উপহার দেন শ্রীদেবী। তাঁর জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে ছিল যে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে জুটি বেঁধে সিনেমা করার প্রস্তাবও একসময় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। শেষ পর্যন্ত ‘খুদা গওয়াহ’ সিনেমায় দুজনকে একসঙ্গে পর্দায় দেখা যায়।
প্রযোজক বনি কাপুরকে বিয়ের পর ৯০-এর দশকের শেষ দিকে অভিনয় থেকে দীর্ঘ বিরতি নেন শ্রীদেবী। প্রায় এক দশক পর ২০১২ সালে গৌরী শিন্ডের ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ দিয়ে বড় পর্দায় ফেরেন তিনি। রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের পরও তাঁর পারিশ্রমিক ছিল বেশ চড়া; প্রতিটি সিনেমার জন্য তিনি প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৫ কোটি রুপি পর্যন্ত পারিশ্রমিক নিতেন।
একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর সময় শ্রীদেবীর মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫০ কোটি রুপি। সিনেমা, বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন নামীদামি ব্র্যান্ডের প্রচারণা থেকে তিনি বিপুল অর্থ উপার্জন করেছিলেন। এ ছাড়া তাঁর প্রায় ৯ কোটি রুপি মূল্যের বিলাসবহুল গাড়ির সংগ্রহ ছিল, যার মধ্যে ছিল অডি, ফোর্ড ও পোর্শে কেয়েনের মতো গাড়ি। পাশাপাশি মুম্বাই ও চেন্নাইয়ে তাঁর তিনটি সুদৃশ্য বাংলো ছিল, যেগুলোর সম্মিলিত মূল্য ৮০ কোটি রুপিরও বেশি।
২০১৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দুবাইয়ে পানিতে ডুবে মারা যান শ্রীদেবী। তবে মৃত্যুর বছর পেরিয়ে গেলেও ভারতীয় সিনেমায় তাঁর প্রভাব ও জনপ্রিয়তা আজও অটুট। অভিনয়, পারিশ্রমিক এবং তারকা-ক্ষমতার দিক থেকে শ্রীদেবীর ক্যারিয়ার আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য স্বর্ণালী অধ্যায়।