রাজধানীর ডেমরা, মতিঝিল ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে একের পর এক বোমা উদ্ধার ও রহস্যজনক বিস্ফোরণের পর সাভারে উগ্রবাদীদের গোপন আস্তানার সন্ধান মেলায় রাজধানীজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে জানা গেছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘নব্য জেএমবি’ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থাতেই তারা একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করে। এই অপতৎপরতার নেপথ্যে মূল পরিকল্পনাকারী বা ‘নাটের গুরু’ হিসেবে কাজ করেছেন নব্য জেএমবির শীর্ষ বোমা বিশেষজ্ঞ নাজমুল হাসান মামুন ওরফে ‘বোমারু মামুন’।
সাম্প্রতিক ঘটনার সূত্রে জানা গেছে, কারাগারে থাকাকালীন নেটওয়ার্ক বিস্তারের পর জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি ও তার সহযোগী জুয়েল ওরফে ওস্তাদ মিলে পুনরায় সংগঠিত হয়ে রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে বড় ধরনের নাশকতার ছক কষছিলেন।
সম্প্রতি রাজধানীর ডেমরা সানারপাড়ায় দুটি বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে বস্তু দুটি সফলভাবে নিষ্ক্রিয় করে। একটি জনাকীর্ণ এলাকায় এই ধরনের বোমা পাওয়ার ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ঘটনাস্থল থেকে জুয়েল নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ডিএমপির ডেমরা জোনের অতিরিক্ত উপ–কমিশনার মীর মুহসীন মাসুদ রানা জানান, ডেমরা এলাকায় পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ও অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) যৌথ অভিযান চালায়। অভিযানে মো. জুয়েল ভুঞা (২৬) নামের এক যুবকের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে তাকে তল্লাশি করা হয়। এ সময় তার হেফাজত থেকে কালো কস্টেপ দিয়ে মোড়ানো আনুমানিক ৬ ইঞ্চি লম্বা ২টি বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়। এ সময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও এক সন্দেহভাজন যুবককে আটক করেছে পুলিশ। পরে সিটিটিসি বোম ডিসপোজাল ইউনিট গিয়ে বোমা দুটি নিষ্ক্রিয় করে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সংগঠনের ভেতরে জুয়েল ‘ওস্তাদ’ নামে পরিচিত। তিনি একজন উগ্রবাদী মতাদর্শের কর্মী এবং সরাসরি নব্য জেএমবির সামরিক শাখার সঙ্গে যুক্ত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা যায়, বোমারু মামুনের প্রত্যক্ষ পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় জুয়েল ডেমরা সানারপাড়া এলাকায় ওই বোমা দুটি বহন করে নিয়ে এসেছিলেন এবং বিশেষ উদ্দেশ্যে সেখানে তা রেখেছিলেন।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ের ধারাবাহিক বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণের প্রায় সবকটির মাস্টারমাইন্ড বোমারু মামুন। এই ওস্তাদ জুয়েল ও বোমারু মামুন পূর্ব পরিচিত। ২০২৩ সালে পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) দায়ের করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে নরসিংদী জেলা কারাগারে ছিলেন জুয়েল। তবে ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই নরসিংদী কারাগার ভেঙে পালিয়ে যান তিনি। পরদিনই ২৫ জুলাই গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে গাজীপুরের অতি-সুরক্ষিত কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে পাঠানো হয়।
কারাগারটিতে আগে থেকেই বন্দি ছিলেন বোমারু মামুন। সেখানে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয় এবং তারা কারাবন্দিদের প্রভাবিত করে শক্তিশালী সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বোমারু মামুন, ওস্তাদ জুয়েলসহ চক্রের বেশ কয়েকজন শীর্ষ সদস্য একে একে কাশিমপুর কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে আত্মগোপনে চলে যান।
কারাগার থেকে বেরিয়ে বোমারু মামুন ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় আস্তানা গড়ার পরিকল্পনা করেন। ঢাকার মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে এবং সাভারের আশুলিয়ায় বোমা উদ্ধারের পর অনুসন্ধানে নেমে সাভারে উগ্রবাদীদের একটি গোপন আস্তানার সন্ধান পায় সিটিটিসি। সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরের এক ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানকে। সেখানে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, দূরনিয়ন্ত্রিত রিমোট, ডেটোনেটর ও তৈরি করা নিষ্ক্রিয় পাইপ বোমা উদ্ধার করা হয়। বোমারু মামুনের মূল লক্ষ্য ছিল সাভারে নব্য জেএমবির জন্য একটি শক্তিশালী বোমা তৈরির ল্যাব গড়ে তোলা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, বোমারু মামুন ২০১৭ সালে পান্থপথের ‘হোটেল ওলিও’-তে ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলার বোমার কারিগর ছিলেন। বর্তমানে সিটিটিসি, এটিইউ ও ডিএমপির একাধিক বিশেষ টিম পলাতক ‘বোমারু মামুন’ ও তার অন্য সহযোগীদের গ্রেপ্তার করতে চিরুনি অভিযান পরিচালনা করছে।