বেলজিয়ামে এক নালার লাইন খনন করার সময় বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের বার এবং দুর্লভ স্বর্ণমুদ্রা উদ্ধার করেছেন একদল নির্মাণশ্রমিক। উদ্ধার হওয়া এই বিশাল গুপ্তধনের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৯০ লাখ ইউরো, যা দেশীয় মুদ্রায় রূপান্তর করলে দাঁড়ায় প্রায় ১২৭ কোটি টাকা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত সিন্ট-জিলিস-ডেন্ডারমন্ডে এলাকায় এই অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটেছে। সেখানকার রাস্তার নিচে ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থার পুরনো পাইপ পরিবর্তনের জন্য খননকাজ চালাচ্ছিলেন নির্মাণশ্রমিকরা। কাজ চলাকালেই হঠাৎ মাটির নিচের একটি গোপন স্থানে এই প্রত্নতাত্ত্বিক ও মূল্যবান গুপ্তধনের সন্ধান মেলে।
গত মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) কোবে নামে ১৮ বছর বয়সী এক চুক্তিভিত্তিক তরুণ নির্মাণকর্মী মাটির নিচে কাজ করার সময় চকচকে এই বস্তুটি প্রথম দেখতে পান। প্রাথমিক অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি জানান, ‘ড্রেনের কাজ করার সময় আমরা হঠাৎ সেখানে ধাতব কিছু একটা পড়ে থাকতে দেখি। শুরুতে ভেবেছিলাম এটি হয়তো সাধারণ ১ ইউরোর কোনো কয়েন বা মুদ্রা হবে। কিন্তু ভালো করে দেখার পরেই ভুল ভাঙে; আমরা একটা খাঁটি স্বর্ণের বার দেখতে পাই। ধুলোবালি সরিয়ে শেষ পর্যন্ত যা দেখা গেল, তা আমাদের কল্পনাকেও হার মানায়। সেখানে আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক গুণ বেশি মূল্যবান স্বর্ণ লুকিয়ে রাখা ছিল।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ‘থিওফিলাস ভ্যান আস’ নামে বেলজিয়ামের এক বিখ্যাত ডিস্টিলারি বা বিয়ার কারখানার মালিকের জন্য এক দৃষ্টিনন্দন ভিলা বা বাসভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ভবনটি পরিত্যক্ত হলেও এর ভূগর্ভস্থ সেলার বা গুদামঘরটি বহাল ছিল। সেই ইটের তৈরি পুরনো সেলারের একটি প্লাস্টার করা দেয়ালের ভেতরে প্লাস্টিকের ব্যাগে থরে থরে সাজানো ছিল বিরল স্বর্ণমুদ্রা, অপরিশোধিত স্বর্ণের টুকরো (নাগেট) এবং নির্দিষ্ট সিরিয়াল নম্বরযুক্ত অত্যন্ত মূল্যবান স্বর্ণের বার। কোবে আরও জানান, স্বর্ণগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গুছিয়ে রাখা হয়েছিল, যা দেখে স্পষ্ট মনে হয় এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই কোনো এক সময়ে সংগোপনে লুকিয়ে রাখা হয়।
ঐতিহাসিক তথ্য সূত্রে জানা যায়, ওই জমিতে ১৮৯৯ সালে প্রথম বিয়ার উৎপাদন শুরু হয়েছিল এবং দীর্ঘ কয়েক দশক চলার পর ১৯৭০ সালে কারখানাটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ঐতিহাসিক ভিলাটির মূল প্রবেশদ্বারের ঐতিহ্যবাহী ফটকে এখনো কারুকাজ করে প্রতিষ্ঠাতা ‘ভিএ’ (ভ্যান আস)-এর নাম খোদাই করা রয়েছে। বর্তমানে একটি স্থানীয় সামাজিক কল্যাণ সংস্থা অফিস ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন তৈরির উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক এই ভবনটির সংস্কারকাজ চালাচ্ছিল।
গুপ্তধন উদ্ধারের পরপরই নিরাপত্তার স্বার্থে উদ্ধারকৃত স্বর্ণের বার ও অলঙ্কারগুলো ব্রাসেলসের একটি নিরাপদ ব্যাংকের ভল্টে স্থানান্তর করেছে বেলজিয়াম কর্তৃপক্ষ। এই গুপ্তধনের আসল মালিক কে কিংবা এটি কার আমলের, তা নির্ধারণে ইতিমধ্যেই ব্যাপক তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
পূর্ব ফ্ল্যান্ডার্স প্রসিকিউটর অফিসের প্রতিনিধি হান ওলেভিয়ার গণমাধ্যমকে জানান, উদ্ধার করা বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কোনো অতীতের চুরি বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত কি না, তদন্তকারীদের তা আগে গভীরভাবে নিশ্চিত হতে হবে। যদি অপরাধের যোগসূত্র না পাওয়া যায়, তবে এর প্রকৃত উত্তরাধিকার ও মালিকানা দাবি নিয়ে পরবর্তীতে দীর্ঘ দেওয়ানি আইনি লড়াই শুরু হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি। উল্লেখ্য, বেলজিয়ামের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কুড়িয়ে পাওয়া যেকোনো প্রত্নতাত্ত্বিক গুপ্তধন বা সম্পদের প্রকৃত মালিকের খোঁজে রাষ্ট্রকে অন্তত পাঁচ বছর মেয়াদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।