ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও বিধ্বংসী দাবানলের মুখোমুখি হয়েছে ইউরোপের দেশ বেলজিয়াম। গত ১৪ আগস্ট শুক্রবার পূর্বাঞ্চলে সূত্রপাত হওয়া এই দাবানলে মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমির গাছপালা ও প্রাকৃতিক বনাঞ্চল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনের তীব্রতা ও দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, যা দেশের ইতিহাসে এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ প্রাকৃতির বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছে।
বেলজিয়ামের পরিবেশ ও বনাঞ্চলের ইতিহাসে এর আগে ২০১১ সালের দাবানলকে সবচেয়ে বড় এবং বিধ্বংসী হিসেবে গণ্য করা হতো। সেই সময়ে ভয়াবহ আগুনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ হেক্টর জমির বনাঞ্চল পুড়ে বিনষ্ট হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের মাত্রা ২০১১ সালের বিপর্যয়কেও বহু দূরে ফেলে দিয়েছে। মাত্র ৭২ ঘণ্টার ব্যবধানে ২০১১ সালের চেয়ে অর্ধেকেরও বেশি বা প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ বনভূমি ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
শুক্রবার দাবানল শুরু হওয়ার পরপরই পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে বেলজিয়াম সরকার পূর্ণমাত্রায় জরুরি অবস্থা জারি করে। জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা দপ্তরের সব কর্মকর্তা ও কর্মীদের অবিলম্বে আগুন নিয়ন্ত্রণে মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি এতটাই সংকটময় হয়ে ওঠে যে পরবর্তী সময়ে দেশের সেনাবাহিনীও আগুন নেভানোর কাজে যোগ দেয়। সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় সাধারণ জনগণ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোও ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সহায়তা করতে এগিয়ে আসে। তবে বৈরী আবহাওয়া ও বাতাসের চরম তীব্রতার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণের সব প্রচেষ্টাই মারাত্মক বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
টানা প্রায় চার দিন ধরে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত আগুনের লেলিহান শিখা কোনোভাবেই আয়ত্তে আনা সম্ভব হয়নি। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বেলজিয়ামের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ ওয়ালোনিয়ার প্রাদেশিক প্রশাসনের মুখপাত্র স্টেফানি এরনক্স জানিয়েছেন, তীব্র শুষ্ক ও প্রবল বাতাসের প্রভাবে দাবানলটি থামার বদলে ক্রমশ নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। ভয়াবহ এই আগুন এখন ধীরে ধীরে জার্মানি সীমান্তের দিকে দ্রুত গতিতে অগ্রসর হচ্ছে, যা পার্শ্ববর্তী দেশের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেলজিয়ামের ফায়ার ব্রিগেডের অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন করিম বৌর্ফা পরিস্থিতির ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি কখনও কল্পনাও করতে পারিনি যে বেলজিয়ামে কখনও এত বড় মাত্রায় দাবানল হতে পারে। এখন এই বিশাল ও অভাবনীয় দাবানল আমাদের মতো কম প্রস্তুত দলকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।” জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উদ্ভূত এই প্রাকৃতিক সংকট সম্পর্কে সতর্ক করে তিনি আরও বলেন, “আমার মনে হয় ভবিষ্যতেও এমন বিপর্যয় বারবার ঘন ঘন ফিরে আসবে। এ কারণে আমাদের এখন থেকেই এই ধরনের ভয়াবহ বিপর্যয় মোকাবিলার জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি ও সরঞ্জাম নিয়ে রাখা উচিত।”
বর্তমানে উদ্ধারকারী দল ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন যেন নতুন কোনো আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে না পড়ে সে লক্ষ্যে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিকূল বাতাসের দিক পরিবর্তন না হলে এবং বৃষ্টিপাত না হলে এই ক্ষতি আরও ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।