ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬,  ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: বিপুল ভোটে জয়ী বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন ১৪ বছর পর পর্দায় ফিরেই তোলপাড়, দেব-শুভশ্রীর রসায়নে নতুন গুঞ্জন টলিপাড়ায় চট্টগ্রাম বন্দরে পাকিস্তান থেকে আসা ৪৯৪ কোটি টাকার তামাক আটক পাকিস্তানে অ্যাম্বুলেন্সে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ নিহত ৯ সখীপুরে মাটির নিচে মিলল দুটি বাক্স, উদ্ধার রকেট লঞ্চারসদৃশ ১২ বস্তু মদ ও সিগারেটের প্রলোভনে কিশোরকে বারবার যৌন নির্যাতন আমরা অবশ্যই এই ভোট নিয়ে সন্তুষ্ট: ইসি সচিব আখতার আহমেদ আন্দোলনে সহিংসতায় জড়ালে মিলবে না সরকারি চাকরি: ভারতের নতুন নীতি হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পাই ড্রোন’ আটক করল ইরান এআই দেখে বিষাক্ত মদ তৈরি: ভারতে ১৩ জনের মৃত্যু

দরপত্র ডেকেও মিলছে না এলএনজি: দেশে তীব্র গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা


  • আপলোড সময় : সোমবার ২৪ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ১০:১৬ এএম

সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) ক্রয়াদেশ দেওয়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি কার্গোও নির্ধারিত সময়ে দেশে পৌঁছাতে না পারায় চরম বিপাকে পড়েছে সরকার। যার ফলে সারা দেশে চাহিদামতো গ্যাসের জোগান দেওয়া একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে জাতীয়ভাবে জরুরি ভিত্তিতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও সংকট কাটার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আগস্ট মাসের চাহিদা মেটাতে তিন কার্গো এলএনজি কেনার লক্ষ্যে পরপর তিন দফায় আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত মাত্র দুটি কার্গো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। দরপত্রে সাড়া না পাওয়া এবং বিশ্ববাজারে অগ্নিমূল্যের কারণে জাতীয় পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না, যার ফলে শিল্প-কারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে চলমান তীব্র সংকট কাটার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে দেশে এলএনজি আমদানির সমুদয় কার্যক্রম তদারক করে থাকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা। আর সরাসরি আমদানির সার্বিক দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে পেট্রোবাংলার সহযোগী সংস্থা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। জ্বালানি আমদানির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, প্রতিবার নতুন করে দরপত্র আহ্বান করতেই আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সরাসরি ডিপিএম পদ্ধতিতে চুক্তি না করে শুরুতেই স্বচ্ছ আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলে তুলনামূলক অনেক কম খরচে প্রয়োজনীয় এলএনজি সংগ্রহ করা সম্ভব হতো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিগত ছয় মাসের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক খোলা বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এশিয়ার স্পট মার্কেটে প্রতি ইউনিট এলএনজির গড় দাম ছিল ১০ থেকে ১১ মার্কিন ডলার। গত এপ্রিল মাসের শেষ নাগাদ তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ থেকে ১৫ ডলারে। কিন্তু জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে তা একলাফে বিশ্ববাজারে বেড়ে প্রায় ২২ মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। এর মূল কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভূরাজনৈতিক চরম সংঘাত, কাতারের পক্ষ থেকে নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিতকরণে চরম অনিশ্চয়তা এবং আসন্ন শীত মৌসুমকে সামনে রেখে ইউরোপীয় দেশগুলোর আগ্রাসী আগাম জ্বালানি মজুত করার প্রবণতাকে দায়ী করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

পেট্রোবাংলা এবং আরপিজিসিএল সূর থেকে পাওয়া প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যে জানা যায়, চলতি আগস্ট মাসের অবশিষ্ট তিনটি এবং আগামী সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের দুটি এলএনজি কার্গো সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গত ১৭ আগস্ট আন্তর্জাতিক দরপত্র দেওয়া হয়। ওই দরপত্রে ২৩-২৪ আগস্ট এবং ৪-৫ সেপ্টেম্বরের দুটি কার্গোর জন্য ২২ ডলারের কম দাম হাঁকিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত হয় বিখ্যাত বিপি (ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম)। তবে অবশিষ্ট তিনটি কার্গোর জন্য কাঙ্ক্ষিত সাড়া না পাওয়ায় ১৮ আগস্ট পুনরায় দরপত্র দেওয়া হলে ১-২ সেপ্টেম্বরের কার্গোর জন্য ২৪ ডলারের নিচে দর হাঁকিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা নির্বাচিত হয় বিশ্বখ্যাত সংস্থা সৌদি আরামকো। পরবর্তীতে ১৯ আগস্ট তৃতীয় দফায় আবারও দুটি কার্গোর জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলে ২৬-২৭ আগস্টের সরবরাহের জন্য প্রতি ইউনিট ২৫ দশমিক ৩১ মার্কিন ডলার দর দিয়ে বিপি সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। তবে ২৯-৩০ আগস্টের কার্গোটির জন্য বিশ্ববাজার থেকে অবিশ্বাস্য চড়া দর প্রস্তাব করায় তা না কেনার কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকার।

গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম মাত্র ১ ডলার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয় প্রায় ৪১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। সেই হিসাবে বিগত কয়েক সপ্তাহে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৪ ডলার বাড়তি দামে এলএনজি কিনতে হওয়ায় কেবল একটি কার্গো আমদানিতেই সরকারের বাড়তি গচ্ছা যাচ্ছে প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা। পূর্বে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ২০ থেকে সাড়ে ২১ ডলারের ভেতরের তিনটি স্বল্পমূল্যের কার্গোর অনুমোদন না দিয়ে সরাসরি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু সরাসরি ক্রয়ের নির্ধারিত চারটি কার্গোর একটিও দেশে না পৌঁছানোতেই এখন চরম জরুরি পরিস্থিতিতে দ্বিগুণ মূল্যে খোলাবাজার থেকে এলএনজি কিনতে গিয়ে বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে রাষ্ট্র।

পেট্রোবাংলার বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান, পেট্রোবাংলা তার সাধ্যমতো পাইপলাইনে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, 'আগের তুলনায় এলএনজি সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। এখন পর্যন্ত যতটুকু গ্যাস আমাদের হাতে পৌঁছাচ্ছে, তা দিয়ে পুরো দেশের সংযোগব্যবস্থা ধরে রাখার চেষ্টা করছি। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি বিভিন্ন চুক্তির অধীনে দ্রুত এলএনজি কার্গো দেশে আনার জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে।'

এদিকে বঙ্গোপসাগরের মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল (এফএসআরইউ) কাজ করছে। এর একটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির এবং অপরটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপের। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেটের টার্মিনালে অনাকাঙ্ক্ষিত অগ্নিদুর্ঘটনার পর সেটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে দেশে গ্যাস সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মক ভেঙে পড়ে। দেশে দিনে প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের বিপরীতে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়, যার মধ্যে ১০৫ কোটি ঘনফুট আসত এই এলএনজি থেকে। কিন্তু বর্তমানে টার্মিনাল সমস্যা ও কার্গো সংকটে গড় সরবরাহের সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে।

বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও শিল্প সংকটের প্রেক্ষাপটে প্রখ্যাত জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম জানান, এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক চড়া দামে এলএনজি আমদানির টানা সামর্থ্য বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেই। তিনি সরকারকে অতি দ্রুত বাস্তবসম্মত পরামর্শ দিয়ে বলেন, 'আপাতত সরকারকে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে কঠোর অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে ফার্নেস অয়েল ও জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে মূল্যবান গ্যাস বাঁচিয়ে তা সরাসরি উৎপাদনশীল শিল্পকারখানায় দেওয়া যেতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বযুদ্ধের আবহ ও আন্তর্জাতিক অস্থিতিশীলতা বিবেচনা করে সরকারকে দ্রুত একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক টেকসই নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।'


এ সম্পর্কিত আরো খবর