ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

জীবনের শেষ অপরাহ্ণে এক সাংবাদিকের আত্মউপলব্ধি, একাকীত্ব ও ন্যায়ের আকুতি


  • আপলোড সময় : সোমবার ৩১ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ১০:৪৫ এএম


আব্দুল কাইয়ুম খান

বেশ কিছুদিন যাবত নিজেকে এক অচেনা একাকীত্বের ঘূর্ণাবর্তে বন্দি মনে হচ্ছে। রাতে বিছানায় শুতে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুম আসে না; এমনকি চিকিৎসকের পরামর্শে ঘুমের ওষুধ খেয়েও সেই নিস্তব্ধ প্রহরগুলোতে চোখের পাতা এক করা সম্ভব হয় না। অবচেতন মনে কড়া নাড়ে জীবনভর জমে থাকা বিষাদ, স্মৃতির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা নানা ভুল সিদ্ধান্ত আর ব্যর্থতার অনুশোচনা।


আজ জীবনের এই গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে বারবার মনে হয়—১৯৮৭ সালে যদি পুলিশ সার্ভিসে সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে যোগ দিতাম, কিংবা যদি তৎকালীন সময়ে আমার বাবা আমাকে যোগ দিতে দিতেন, তবে হয়তো জীবনের পথচলাটা অন্যরকম হতে পারতো। ঘুষ না খেয়েও শতভাগ সততার সঙ্গে অসংখ্য অসহায় মানুষকে সেবা দেওয়া সম্ভব হতো। থানায় গিয়ে যারা অন্যায় ও নির্যাতনের শিকার হয়, তাদের পাশে দাঁড়ানো যেত। একটি হিসাব কষে দেখেছি, ৩৫ বছরের চাকরিজীবনে হয়তো অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এডিশনাল এসপি) হিসেবে অবসর নিতাম। যে বেতন পেতাম, তা হয়তো পেশাগত জীবন থেকে প্রাপ্ত অর্থের চেয়ে খুব বেশি হতো না; কিন্তু ক্ষমতার যে সুরক্ষা থাকত, তা আমার জীবনকে অন্যভাবে রক্ষা করতে পারতো।


আমার গ্রামের বাড়ির পৈতৃক সম্পত্তি চাচা জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছেন। কিছু সম্পত্তি বাধ্য হয়ে বিক্রি করতে হয়েছে। জমিজমা নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত মামলার মুখোমুখি হয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছি। পুলিশের চাকরিতে থাকলে হয়তো কোনো অন্যায় সুবিধা না নিয়েও অন্তত নিজের ন্যায্য অধিকারটুকু রক্ষা করতে পারতাম। ঢাকার মধ্য বাড্ডা এবং নন্দীপাড়ার আবাসনটুকুও হাতছাড়া হতো না। তাহলে জীবনের শেষ সময়টায় হয়তো কিছুটা আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য থাকত, অসচ্ছল ও মুমূর্ষু মানুষের চিকিৎসায় নিঃসংকোচে হাত বাড়িয়ে দিতে পারতাম, যা থেকে বঞ্চিত হয়ে আজ মন বারেবারে কুরে কুরে খায়।


সম্প্রতি গ্রামের এক সম্পর্কিত বোনের জামাই মারা যান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সেই মৃত্যুর খবরটি আমাকে কেউ ফোন করে জানায়নি। আত্মীয়স্বজনরা জেনে গেছে, এই মানুষটির কাছে এখন আর কোনো অর্থকড়ি নেই; সুতরাং তাকে জানিয়ে তো কোনো ফায়দা হবে না! এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের বর্তমান সমাজের এক নির্মম বাস্তবতার দলিল। অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়ে সামান্য আর্থিক সহায়তাটুকুও করতে পারিনি কেবল মাসের শেষে হাত খালি থাকার কারণে। এই অক্ষমতা আর বিবেক দংশন আমাকে প্রতিনিয়ত পীড়িত করে।


বাস্তবতা হলো, আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনই আজ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। সরকারি পেনশন আর ফিক্সড ডিপোজিটের সামান্য সুদের ওপর ভর করেই আমাদের সংসার চলে। প্রতি মাসে ভারত থেকে আমার প্রায় ৩০ হাজার টাকার জীবনরক্ষাকারী ওষুধ আনতে হয়, যা আমাদের আয়ের সিংহভাগই কেড়ে নেয়। সারাদিন এক চরম একাকীত্বের মধ্য দিয়ে সময় অতিক্রম করি, মনে হয় প্রহর যেন কিছুতেই পার হতে চায় না। হৃদয়ের গহীনে জমে থাকা এই অপরিসীম কষ্ট ও আত্মগ্লানি লোকলজ্জার ভয়ে কারও কাছে প্রকাশ করতে পারি না।


এর ওপর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে মানসিক যাতনা দিন দিন ভারী হচ্ছে। অনেক আশা নিয়ে সন্তানকে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করিয়েছি, পরবর্তীতে সে লন্ডন থেকে ইনফরমেশন টেকনোলজিতে প্রকৌশল ডিগ্রি অর্জন করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে কোনো কাজ করে না; সারাদিন ঘুমিয়ে আর গেম খেলে সময় পার করে। সন্তানের এই দিশাহীন জীবন দেখে একজন বাবার বুকফাটা হাহাকার কেবল নিঃশব্দেই ঝরে পড়ে।


এই গভীর হতাশা ও অন্ধকারের মাঝেও কৃতজ্ঞতার এক উজ্জ্বল আলো হয়ে পাশে আছেন আমার চাচাতো ভাই মোশারফ হোসেন খান (গেলমান দাদা)। তিনি সবসময় আমার প্রকৃত অভিভাবকের মতো ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এমনকি লন্ডনে অবস্থানকালেও তিনি আমার মামলা-মোকদ্দমার খোঁজখবর নেন এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন। যেহেতু আমার কোনো আপন বড় ভাই নেই, তাই তাকেই আমি নিজের আপন ভাই হিসেবে মান্য করি। যাদের সাথে আমার সম্পত্তি নিয়ে আইনি লড়াই চলছে, সেই স্বজনদের অসৎ চাল ও গোপন খবরগুলো জানিয়ে তিনি আমাকে প্রতি মুহূর্তে সাহসের সঞ্চার করেন। এই কঠিন সময়ে তার এই সহমর্মিতা আমার বেঁচে থাকার পরম শক্তি।


একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে সততার সাথে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কলম ধরেছি। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অপকর্মের ওপর এ পর্যন্ত ১৮০টিরও বেশি অনুসন্ধানমূলক তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছি। অথচ ভাগ্যের চরম নির্মম পরিহাস, সেই আমাকেই আজ আদালতের দোরগোড়ায় দুর্নীতির শিকার হতে হচ্ছে।


গাজীপুরের বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারী কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় আমার একটি পিটিশন মামলা চলছে (মামলা নম্বর: ৫৮৪/২২)। যেখানে আমি স্বয়ং বাদী এবং বিবাদী রোকনুজ্জামান ওরফে ভুয়া রনি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সংশ্লিষ্ট আদালতের পেশকার মোঃ সুরুজ্জামান আমার মূল কাগজপত্রগুলো সবার নিচে চাপা দিয়ে রেখে বিবাদী পক্ষের ফাইলগুলো উপরে উপস্থাপন করেন এবং আমাকে নানাভাবে হয়রানির মুখোমুখি করেন। একটি নিরপেক্ষ আদালতে ফাইলসমূহ তারিখ অনুযায়ী সাজানো থাকার কথা থাকলেও তা করা হচ্ছে না।


গাজীপুরের জুডিশিয়াল আদালত এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত—উভয় স্থানেই নিজের মামলার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে পরম আক্ষেপের সাথে বলতে হচ্ছে, বিচারিক সততার চরম অভাব সেখানে প্রকট। আমার মামলার বিবাদী একাধিক চাঁদাবাজি মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি। বিজ্ঞ বিচারককে বারংবার সেই ওয়ারেন্ট লেটার দেখানোর পরও তিনি বলে দেন, "সেটা আপনার দেখার বিষয় না, আমি দেখব।" একজন ফেরারি আসামি আদালতে সশরীরে উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও নথিপত্রে কীভাবে তাকে 'উপস্থিত' দেখানো হয়, তা আমার বোধগম্য নয়।


আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই বিবাদী গাজীপুর জেলা ছাত্রলীগের নিষিদ্ধ ঘোষিত সহ-সভাপতি এবং সে জেলা বিএনপির কার্যালয় ভাঙচুর মামলায় দীর্ঘদিন কারাগারে বন্দি ছিল। বর্তমানেও সে একাধিক মামলার পলাতক আসামি। অথচ রহস্যজনকভাবে তার আইনজীবী, আদালতের পেশকার ও বিচারক মিলে গত দুই বছর ধরে তাকে নিয়মিত হাজিরায় 'উপস্থিত' দেখিয়ে যাচ্ছেন! বিচারব্যবস্থার এই যদি হয় নগ্ন রূপ, তবে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের আশায় কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?


এমতাবস্থায়, পরম করুণাময়ের কাছে এবং মাননীয় জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আমার আকুল মিনতি—অবিলম্বে আমার মামলার বিচারক পরিবর্তন করা হোক এবং সংশ্লিষ্ট পেশকারের এই অসাধু কার্যকলাপের সত্যতা যাচাইয়ে মামলার নথিগুলো পরীক্ষা করা হোক। একজন সাংবাদিক হিসেবে এ দেশের মাটি থেকে দুর্নীতি নির্মূল করাই ছিল আমার আজীবনের ব্রত। বিচারালয়ের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমার কলম কোনোদিন স্তব্ধ হবে না; প্রয়োজনে এই দুর্নীতির চিত্র আমি দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও বিচারিক পর্যায়ে পৌঁছে দেব।


মাঝে মাঝে এই অন্যায় আর নিঃসঙ্গতা দেখে নিজেকে বড্ড অপরাধ্য মনে হয়, আত্মগ্লানি ঘিরে ধরে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা ওল্টালে পরম সান্ত্বনা পাই। আমাদের জাতীয় কবি, কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের শেষ দিনগুলোর কথা ভাবি। ১৯৪২ সালে যখন তিনি মারাত্মক ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন, তখন তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল না। অথচ এই কালজয়ী কবি তাঁর 'বিদ্রোহী' কবিতা দিয়ে সমগ্র ব্রিটিশ ভারতকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন, কাঁপিয়ে তুলেছিলেন শোষকের ভিত। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির অনন্য বার্তা ছড়িয়ে শ্যামাসংগীত ও গজল রচনা করে কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন তিনি।


সেই মহান কবি যখন নিঃস্ব ও অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক কিংবা 'গণতন্ত্রের মানসপুত্র' হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো বড় বড় নেতাদের কাছে গিয়েও কোনো কার্যকর সহায়তা পাওয়া যায়নি। কবি নজরুল ইসলামের সেই চরম দুদিনে তাঁর একমাত্র সঙ্গী ছিলেন তাঁর পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্ত্রী ও শাশুড়ি। শেষ পর্যন্ত ভারত সরকার যখন তাঁর চিকিৎসার উদ্যোগ নেয়, ততক্ষণে কবির জীবনের মূল্যবান সময় ও স্বাস্থ্য প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। একদিকে ছিল চরম আর্থিক সংকট, অন্যদিকে মানসিকভাবে কবিকে ঘিরে রেখেছিল এক অসীম একাকীত্ব।


জাতীয় কবির চরণের একটি ধূলিকণার সমতুল্য যোগ্যতাও আমার নেই। যদি নজরুলের মতো মহীরুহের জীবনেও এমন করুণ একাকীত্ব ও অবহেলা নেমে আসতে পারে, তবে আমার মতো সাধারণ মানুষের এই কষ্ট তো স্বাভাবিক। পরবর্তীতে স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরম শ্রদ্ধায় কবিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয় এবং ধানমন্ডিতে কবির বাসস্থানের ব্যবস্থা করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ভূষিত করা হয়। কবির সেই অমর গানের সুরাই যেন সত্য হয়ে ফুটলো—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশেই আজ তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত, যেখানে প্রতিদিন মোয়াজ্জিনের সুমধুর আযান প্রতিধ্বনি হয়।


মহাকবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি বিনীত শ্রদ্ধা জানিয়ে আজও পরম আশায় পথ চেয়ে আছি—হয়তো আমার এই নিভৃত কান্না, ন্যায়ের আকুতি এবং বিচারালয়ের অন্যায়ের করুণ চিত্র কোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের হৃদয়ে গিয়ে আঘাত হানবে। জীবনসায়াহ্নে এসে আমার চাওয়া খুব বেশি নয়; কেবল নিজের জমিটুকুর ন্যায্য বিচার, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে কিছু মানুষের সেবা করার সামর্থ্য এবং একটু মানসিক শান্তি। এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজে কি ন্যায়বিচার ও মানবতার আলোটুকু পৌঁছাবে না?

পরিচালক, দুর্নীতি দমন মুভমেন্ট


এ সম্পর্কিত আরো খবর