সেনানিবাসে
বাবুর্চির কাজের প্রলোভন দেখিয়ে গত বছর লক্ষ্মীপুরের
জাহাঙ্গীর আলমকে নিয়ে যাওয়া হয় রাশিয়ায়। কিন্তু
খাবার তৈরির বদলে তাঁকে পাঠানো হয় সরাসরি ইউক্রেন
যুদ্ধক্ষেত্রে। দীর্ঘ সাত মাস প্রাণ হাতে নিয়ে কাটানোর পর বাংলাদেশ দূতাবাসের
সহায়তায় দেশে ফেরেন তিনি। জাহাঙ্গীর জানান, কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই অস্ত্র হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল তাঁদের ১৬ জনের একটি
দলকে। যুদ্ধে চার সতীর্থের মৃত্যুর পর অসুস্থ হয়ে
হাসপাতালে কাটে তাঁর দুটি মাস, সেখান থেকেই পালিয়ে কোনোরকমে দেশে ফেরেন তিনি। রাশিয়ার মতো অচিরাচরিত শ্রমবাজারে গিয়ে এভাবেই প্রতারণা ও চরম জীবনঝুঁকির
মুখে পড়ছেন বাংলাদেশি অনেক তরুণ।
মধ্যপ্রাচ্য
ও মালয়েশিয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী বড় শ্রমবাজারগুলো সংকুচিত
বা বন্ধ হয়ে আসায় বাধ্য হয়ে বিকল্প পথ খুঁজছেন বাংলাদেশি
কর্মীরা। ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মালয়েশিয়ায় কর্মী
যাওয়া কমেছে বা পুরোপুরি বন্ধ
রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই রাশিয়া, কম্বোডিয়া বা অবৈধ পথে
ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর
(বিএমইটি) তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালে কম্বোডিয়ায় ১২ হাজার ২৬৩
জন এবং রাশিয়া ফেডারেশনে ৪ হাজার ৭২৭
জন বাংলাদেশি ছাড়পত্র নিয়েছেন। স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করানো ও ইউক্রেন যুদ্ধে
পাঠানোর মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছেন এসব দেশে যাওয়া তরুণরা।
চলতি
বছরে সার্বিকভাবে বিদেশে কর্মী গমন আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। বিএমইটির তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) বিদেশে যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র নিয়েছেন প্রায় ৫ লাখ কর্মী,
যেখানে গত বছর একই
সময়ে এই সংখ্যাটি ছিল
প্রায় ৭ লাখ ৪০
হাজার। সে হিসাবে এক
বছরে ছাড়পত্র কমেছে প্রায় ১ লাখ ৪০
হাজার। মধ্যপ্রাচ্যে ওমান ও বাহরাইনে নিয়োগ
বন্ধ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রবাসীদের প্রবেশ প্রায় স্থগিত এবং মালয়েশিয়ার বাজার বন্ধ থাকায় এই সংকট ঘনীভূত
হয়েছে। অন্যদিকে ৭০ শতাংশ কর্মী
যাচ্ছেন সৌদি আরবে, কিন্তু সেখানেও চাহিদার অতিরিক্ত কর্মী পাঠানোয় কাজ না পাওয়ার অভিযোগ
উঠছে হরহামেশা।
বাংলাদেশের
অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। গত পাঁচ অর্থবছরে
প্রবাসীরা গড়ে বছরে ২ হাজার ৬৪৯
কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক
প্রবাসী আয়ের তালিকায় সপ্তম স্থানে রেখেছে। তবে শ্রমবাজারের অতি-নির্ভরতা গুটিকয়েক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় তা বড় ঝুঁকিতে
পড়েছে। ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে ২০৩টি
দেশে মোট ১ কোটি ১০
লাখের বেশি কর্মী পাঠানো হলেও তার প্রায় ৭৯ শতাংশ গেছেন
মাত্র পাঁচটি দেশে, আর ৯৪ শতাংশ
কর্মী গেছেন ১০টি দেশে। নতুন বাজারে টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করতে না পারায় প্রতারণা
ও মানব পাচার বাড়ছে।
রাশিয়া
ও কম্বোডিয়ার পাশাপাশি ইতালি পৌঁছানোর আশায় অবৈধ পথে লিবিয়া পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য বাংলাদেশি। ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়া দেশের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে শীর্ষ স্থানে। দালালদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে ট্রাভেল পাস নিয়ে দেশে ফিরছেন হাজার হাজার প্রবাসী। মানব পাচারের অপরাধে সিআইডির পক্ষ থেকে মামলা ও অভিযোগ দায়ের
করা হলেও আইনি ফাঁকফোকরে অধিকাংশ আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছে, যা মানব পাচার
প্রতিরোধকে বাধাগ্রস্ত করছে।
খাত
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যাও এই সেক্টরে চরম
বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে এজেন্সির সংখ্যা পরিমিত হলেও বাংলাদেশে বর্তমানে ২ হাজার ৬৪৬টি
লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্সি রয়েছে, যা তদারকি করা
কঠিন। সম্প্রতি দুর্নীতির দায়ে ৪৯টি এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
সংকট
নিরসনে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান
প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক জানান, বন্ধ
থাকা বাজারগুলো চালু করা এবং নতুন ও নিরাপদ শ্রমবাজার
গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও কার্যকর আলোচনা
চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু সরকারি প্রতিশ্রুতি নয়, যাচাই-বাছাই ছাড়া বিপজ্জনক বা অস্পষ্ট কর্মসংস্থানে
ছাড়পত্র দেওয়া বন্ধ করতে হবে এবং নিয়ম মেনে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।