অনলাইন রিপোর্টার
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘গ্রামীণ কল্যাণ’-এর কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতেই হবে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ বিষয়ে পূর্বে জারি করা রুল খারিজ করে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া এবং বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। রিট রুল খারিজ হওয়ার ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দাবিকৃত ৬৬৬ কোটি টাকা কর বাবদ আদায় করার ক্ষেত্রে আইনি আর কোনো বাধা রইল না।
আদালতে ড. ইউনূস ও গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন ও ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ তথা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষে আইনি শুনানি পরিচালনা করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আব্দুস সামাদ আজাদ।
মামলার নথি ও আইনি ইতিহাস সূত্রে জানা গেছে, এর আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গত ৪ অক্টোবর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর প্রদান সংক্রান্ত হাইকোর্টের পূর্বের একটি রায় স্বপ্রণোদিতভাবে প্রত্যাহার (রিকল) করে নিয়েছিলেন আদালত। তৎকালীন বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের হাইকোর্ট বেঞ্চ পূর্বের রায়টি প্রত্যাহার করে মামলার সমস্ত নথি প্রধান বিচারপতির কাছে প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে প্রধান বিচারপতি মামলাটির পুনর্মূল্যায়ন ও নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন নতুন দ্বৈত বেঞ্চে নথিটি পাঠায়।
মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭—এই পাঁচটি করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে প্রদেয় আয়কর দাবি করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। এনবিআরের এই বকেয়া আয়কর দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট তৎকালীন সময়ে রুল জারি করেছিলেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও রুল শুনানি শেষে হাইকোর্টের নতুন দ্বৈত বেঞ্চ রুল দুটি খারিজ করে চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন।
রায়ের পর এনবিআরের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আব্দুস সামাদ আজাদ মামলার মূল বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করে জানান, গ্রামীণ কল্যাণের সঙ্গে গ্রামীণ টেলিকমের একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, গ্রামীণ টেলিকম থেকে গ্রামীণ কল্যাণকে কিছু আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হতো। ওই আর্থিক সহায়তার প্রতিদান হিসেবে গ্রামীণ টেলিকমে থাকা গ্রামীণ কল্যাণের শেয়ার থেকে অর্জিত লভ্যাংশ (ডিভিডেন্ড) থেকে ৪২.৫০ শতাংশ প্রফিট গ্রামীণ কল্যাণকে প্রদান করার কথা ছিল।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আরও জানান, পরবর্তীতে আয়কর কর্তৃপক্ষ আয়কর আইনের ১২০ ধারা (আন্ডার সেকশন ১২০) অনুযায়ী গ্রামীণ কল্যাণের ট্যাক্স ফাইল পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবার চালুর (রিওপেন) সিদ্ধান্ত নেয়। সেখানে আয়কর কর্তৃপক্ষ দেখতে পায় যে, গ্রামীণ টেলিকম থেকে গ্রামীণ কল্যাণ যে বিপুল পরিমাণ মুনাফা অর্জন করেছে, সেটির ওপর তারা নিয়ম অনুযায়ী উৎসস্থলে কর (উৎসে কর) কর্তন করেনি। এই অনিয়ম ধরা পড়ার পর কর কমিশনারের কাছে রিভিশন আবেদন করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট পিটিশন ফাইল করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।
হাইকোর্ট উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে রুল ডিসচার্জ করায় পুরো রায়টি আয়কর বিভাগ তথা সরকারের পক্ষে এসেছে। আইন কর্মকর্তা আব্দুস সামাদ আজাদ নিশ্চিত করেছেন যে, আদালতের এই আদেশের পর আয়কর বিভাগ খুব শীঘ্রই আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রদেয় পাওনা আদায়ের চাহিদা পত্র (ডিমান্ড নোটিশ) ইস্যু করবে এবং দাবিকৃত ৬৬৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ে পরবর্তী আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
আকাশজমিন / আরআর