রাজধানীর
খিলগাঁও থানাধীন বনশ্রী এলাকার ব্যস্ততম সড়কে দুটি যাত্রী বাসের চরম বেপরোয়া গতির বলি হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তাসফিয়া আহমেদ তিশা নামের এক উদীয়মান নারী
শিক্ষক। মর্মান্তিক এই সড়ক দুর্ঘটনায়
নিহত তাসফিয়া আহমেদ তিশা রাজধানীর স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কর্মরত ছিলেন।
তার
এই আকস্মিক, অস্বাভাবিক ও করুণ মৃত্যুতে
গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার শোকস্তব্ধ পরিবার, সহকর্মী এবং প্রিয় শিক্ষার্থীদের মাঝে। নিহত তাসফিয়া চাঁদপুর সদর উপজেলার প্রফেসর পাড়ার নিবাসী মো. শফিউদ্দিন আহমেদের কন্যা। তিনি কর্মক্ষেত্র ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে
খিলগাঁও এলাকার মেরাদিয়ার নয়াপাড়ায় বসবাস করতেন। প্রতিদিনের মতো সেদিনও নিজের কর্মব্যস্ত জীবন এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে ঘর থেকে বের
হয়েছিলেন তিনি, কিন্তু এই যাত্রা যে
তার জীবনের শেষ যাত্রায় পরিণত হবে তা তার পরিবার
কিংবা সহকর্মীদের কেউ কখনো ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি।
পুলিশ
ও পারিবারিক সূত্রে বিস্তারিত তথ্যে জানা যায়, মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক এই
দুর্ঘটনাটি ঘটে গত বুধবার ১৬
সেপ্টেম্বর রাতে। ওই দিন সন্ধ্যার
কিছু সময় পরে তাসফিয়া তিশা ব্যক্তিগত একটি মোটরসাইকেলযোগে বনশ্রী ফরাজী হাসপাতালের সামনের ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে তার এক সহকর্মীর বাসার
উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলেন। চলাচলের সময় খিলগাঁও বনশ্রী এলাকার ওই সড়কে বিপরীত
দিক থেকে আসা রমজান পরিবহনের একটি দ্রুতগতির যাত্রীবাহী বাস চরম বেপরোয়া গতিতে এসে তার চালিত মোটরসাইকেলটিকে অত্যন্ত সজোরে ধাক্কা দেয়।
বাসের
জোরালো ধাক্কায় তিনি চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে সরাসরি রাজপথের পিচঢালা রাস্তার ওপর পড়ে যান। ঠিক সেই বিপজ্জনক মুহূর্তে পেছনের দিক থেকে কিংবা পাশ দিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে চলা সারা পরিবহনের অপর একটি বেপরোয়া বাসের চাকা তার মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়। এই ভয়াবহ ও
রোমহর্ষক পরিস্থিতিতে তার মাথা গুরুতরভাবে থেঁতলে যায় এবং তিনি ঘটনাস্থলেই মারাত্মকভাবে জখম হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন।
দুর্ঘটনার
পর পরই আশপাশের পথচারী, স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন জনতা
এগিয়ে আসেন। তারা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে গুরুতর আহত অবস্থায় তাসফিয়া তিশাকে উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় বনশ্রী ফরাজী হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা চলাকালীন কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি লক্ষ করে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্থানান্তর করার পরামর্শ দেন।
পরবর্তীতে
পরিবারের লোকজন ও স্থানীয়দের সহায়তায়
তাকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয়। রাত পৌনে নয়টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে নিবিড়ভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে মৃত বলে ঘোষণা করেন। চিকিৎসকদের এই ঘোষণা আসার
সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালের চারপাশ শোকে ভারী হয়ে ওঠে, কান্নায় ভেঙে পড়েন তার সঙ্গে থাকা স্বজনেরা।
এদিকে
এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ তৎপরতা প্রদর্শন করে। খিলগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অনয় চন্দ্র পাল গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, ঘটনার সময় বনশ্রী এলাকায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা ওয়্যারলেসের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই ভয়াবহ সড়ক
দুর্ঘটনার সংবাদ থানায় ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের
জানান।
তথ্য
পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের একটি দায়িত্বশীল দল কালক্ষেপণ না
করে দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ ও স্থানীয়দের যৌথ
প্রচেষ্টায় ঘাতক বাস দুটিকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা সম্ভব হয়েছে। একইসঙ্গে দুর্ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত একটি বাসের চালক এবং অপর একটি বাসের হেলপারকে আটক করে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
এই
নৃশংস ও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার
পর খিলগাঁও থানায় সংশ্লিষ্ট আইনে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। রাজধানীতে প্রতিদিন ফিটনেসবিহীন ও বেপরোয়া চালকদের
অবাধ যাতায়াত এবং ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা না করার প্রবণতার
কারণে অহরহ ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ, যা রোধে প্রশাসনের
আরও কঠোর নজরদারির জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন নগরবাসী।