জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে যোগ দিয়ে তরুণ সমাজ, প্রযুক্তি এবং সামাজিক ব্যবসার শক্তি কাজে লাগিয়ে একটি মানবিক ও ইতিবাচক পৃথিবী গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ও বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।
সোমবার নিউইয়র্ক সময় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের প্রাক্কালে ‘সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি’ শীর্ষক একাদশ উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে প্রধান বক্তা হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি। এই আয়োজনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান, তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস-হোর্তা এবং ব্রাজিলের সামাজিক উন্নয়ন ও সহায়তা, পরিবার ও ক্ষুধামুক্তিমন্ত্রী ওয়েলিংটন দিয়াসসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
বক্তব্যের শুরুতেই বৈশ্বিক কূটনীতির বর্তমান গতিপ্রকৃতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে ড. ইউনূস বলেন, আধুনিক কূটনীতির ভাষা থেকে প্রায়শই শব্দের আসল অর্থ হারিয়ে যায়, যার ফলে যুদ্ধ এবং শান্তির মতো মৌলিক ধারণার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সাধারণ পরিষদের এই নতুন অধিবেশন শব্দের প্রকৃত তাৎপর্য ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এই অধিবেশনের সিদ্ধান্তের দিকে নিবদ্ধ রয়েছে।
ক্ষুদ্রঋণের সফলতার ইতিহাস তুলে ধরে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পরিচালিত ‘গ্রামীণ আমেরিকা’ কর্মসূচি প্রমাণ করেছে যে উন্নত দেশগুলোর প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নেও এটি কতটা কার্যকর। ২০০৮ সালে নিউ ইয়র্কে মাত্র পাঁচশো ডলারের প্রাথমিক ঋণ সীমা নিয়ে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার পরিমাণ বর্তমানে আট বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং এর ঋণ পরিশোধের হার প্রায় শতভাগ। হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি পুরুষদেরও এই কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। তবে আমানত গ্রহণ বা সঞ্চয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আইনি কিছু জটিলতা এখনও রয়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সামাজিক ব্যবসার রূপরেখা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ড. ইউনূস বলেন, কেবল মুনাফা অর্জন মানুষকে প্রকৃত সুখ দেয় না, বরং অন্যের জীবন বদলানোর আনন্দ একেবারেই আলাদা। সামাজিক ব্যবসা মূলত মানুষের নিত্যদিনের সমস্যা সমাধানে কাজ করে। বাংলাদেশে এই মডেলের সফল বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, বর্তমানে ১৫৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং গ্রামীণ ফোনের সহায়তায় দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষের জন্য টেলিমেডিসিন সেবা চালু রয়েছে। এছাড়া সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ চক্ষু হাসপাতালের নেটওয়ার্ক নিজস্ব আয়েই নতুন হাসপাতাল তৈরি করছে।
তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের কেবল চাকরির পেছনে ছোটায়, অথচ মানুষ জন্মগতভাবেই উদ্যোক্তা। এই চিন্তাধারা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চলতি বছরের ডিসেম্বরে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে। ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ গড়ার প্রত্যয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের গতানুগতিক সনদের পরিবর্তে সরাসরি দক্ষ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলবে। পরিশেষে তিনি দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কার্বন নিঃসরণমুক্ত একটি সুন্দর পৃথিবী গড়তে সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানান।