নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত বীরদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বিশ্বমঞ্চের এই মর্যাদাপূর্ণ সম্মেলনে বাংলায় বক্তব্য প্রদানকালে তিনি বাংলাদেশের দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস এবং ছাত্র-জনতার অসামান্য আত্মত্যাগের বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেন।
বিশ্বনেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে প্রদত্ত এই ভাষণের শুরুতেই তিনি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতিটি ধাপে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের অসামান্য অবদান বিনম্র চিত্তে স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের পরিসমাপ্তি ঘটেছে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে, যা আজ বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে সব ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এই অভূতপূর্ব বিজয়ের পেছনে রয়েছে লাখো তরুণের রক্ত ও অগণিত মানুষের নির্যাতন ভোগের দীর্ঘ ইতিহাস, যা তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের এই গণঅভ্যুত্থানে যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং যারা চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন কিংবা গুরুতর আহত হয়েছেন, জাতি তাদের এই বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগকে কখনোই ভুলবে না। তাদের তাজা রক্তের বিনিময়েই আজ দেশে নতুন গণতান্ত্রিক ধারার পথ উন্মোচন হয়েছে। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী আরও জানান যে, চলতি বছরের গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে একটি অত্যন্ত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনে এ দেশের শান্তিকামী ও গণতন্ত্রমনা জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে বিপুল ভোটে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছে। এই ঐতিহাসিক বিজয় অর্জনের পর দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে তিনি আন্তরিক অভিনন্দন জানান এবং তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়েছে যে এ দেশের মানুষ গণতন্ত্র, সুশাসন এবং নাগরিক অধিকার ছাড়া অন্য কিছু চায় না।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বমঞ্চে নিজের রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরে বলেন যে, তারা সবসময় বিশ্বাস করেন জনগণই সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার একমাত্র উৎস। জনগণের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করার কোনো সুযোগ নেই এবং বর্তমান সরকার জনগণের সেই মৌলিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখতে সর্বদা বদ্ধপরিকর। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশনটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশ্বনেতারা বাংলাদেশের এই উত্তরণ এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণে দেশের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বশান্তি বজায় রাখা এবং মানবাধিকার রক্ষায় বাংলাদেশ সর্বদা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পাশে থাকবে বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের এই ভাষণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা এবং জনগণের বিজয়ের বার্তা বিশ্বমঞ্চে জোরালোভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে, যা দেশের ভাবমূর্তিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও বেশি উজ্জ্বল করেছে এবং বিশ্ববাসীর সামনে এক নতুন বাংলাদেশের ইতিবাচক রূপরেখা তুলে ধরেছে।