রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার অন্তর্গত ইসিবি চত্বরের নিকটবর্তী জনবহুল দক্ষিণ মানিকদী এলাকায় একটি বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে রাতের আঁধারে ভয়াবহ ও রোমহর্ষক সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। সিনেমাটিক কায়দায় প্রায় আড়াই থেকে তিনশ সন্ত্রাসী একাধিক পিকআপ ভ্যানে চড়ে অতর্কিতভাবে সেই এলাকায় প্রবেশ করে এবং ত্রাস সৃষ্টি করতে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও দেশীয় অস্ত্রের নগ্ন তাণ্ডব চালায়। এই বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলায় দেশের পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ব্যাপক ভাঙচুরের শিকার হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে গত শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাত দশটার দিক থেকে শুরু করে সাড়ে দশটার মধ্যে। দক্ষিণ মানিকদীর নিউগিনি হাউজিং প্রজেক্ট বা নিউগিনি প্রোপার্টিজের প্রধান ফটক ও আশপাশের এলাকায় এই আকস্মিক আক্রমণ চালানো হয়। প্রায় পাঁচ বিঘা জমির ওপর নির্মিত ১৭টি বহুতল ভবন সংবলিত এই আবাসিক প্রকল্পটিতে মানুষের বসবাস এখনো তুলনামূলকভাবে কম। স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, মুখোশ পরিহিত প্রায় আড়াই থেকে তিনশ ব্যক্তি চারটি পিকআপ ভ্যানে করে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এলাকায় ঢুকে পড়ে। তারা পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে স্থাপন করা সমস্ত সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে চুরমার করে দেয়। এ সময় তাদের অনেকের হাতে ছিল পিস্তল, রামদা ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র। যাঁরা বাধা দিতে এসেছেন, তাঁদের কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।
আহত কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, সন্ত্রাসীরা মূল গেট দিয়ে অতর্কিতভাবে ঢুকে পড়ে। তাঁদের পিস্তল ধরে এবং ছুরি দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত করা হয়। কারও কারও মাথায় সজোরে বাড়ি দিয়ে গুরুতর জখম করা হয়।
হাউজিং সোসাইটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই হামলার পেছনে রয়েছে একটি প্রভাবশালী মহলের চাঁদাবাজ চক্র। নিউগিনি প্রোপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রকম চাঁদাবাজি, হুমকি-ধমকি, জমি দখলসহ নানান ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ঘটনার রাতে প্রায় আড়াইশ থেকে তিনশ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী প্রধান ফটকে এসে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। অফিসকক্ষ থেকে প্রায় এক কোটি টাকা লুট করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এই নৃশংস সহিংসতার সবচেয়ে বড় আঘাত এসে পড়ে জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওর ওপর। দুর্বৃত্তরা তাঁর স্টুডিওতে জোরপূর্বক প্রবেশ করে সমস্ত সরঞ্জাম ভাঙচুর করে এবং সেখানে থাকা কর্মীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে ব্যাপক লুটপাট চালায়। দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে চরম হতাশা ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সালমান মুক্তাদির বলেন, “এটা বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মানুষের ব্যর্থতা। প্রত্যেকটা পলিটিক্যাল পার্টির ব্যর্থতা। হইছে তো, এইটা তো বাংলাদেশী। উই হ্যাভ টু অ্যাকনলেজ দিস, এটাই বাংলাদেশ। আমি বাংলাদেশী আইনে বিশ্বাস করি না। আমি আইনের ব্যাপারে অনেক নাস্তিক বাংলাদেশে।”
এদিকে খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে দুর্বৃত্তরা আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে সংক্ষিপ্ত গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গিয়াস উদ্দিন গণমাধ্যমকে জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থল থেকে তাঁরা দুটি ছুরি ও চার রাউন্ড গুলির খোসা উদ্ধার করেছেন। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই, বরং মূল কারণ হলো জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ। তবে সেনানিবাসের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার কাছাকাছি জনবহুল স্থানে কীভাবে এত বড় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে তাণ্ডব চালালো, তা নিয়ে দক্ষিণ মানিকদীবাসীর মনে তীব্র আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।