প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, পাহাড় ও প্রবালের আধার হওয়া সত্ত্বেও বৈশ্বিক পর্যটন মানচিত্রে কাঙ্ক্ষিত স্থান অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। পর্যাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও শত শত হোটেল-রিসোর্ট গড়ে উঠলেও বিশ্বমানের পর্যটন সুবিধা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে এ জনপদ আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পিছিয়ে পড়ছে।
বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে পর্যটন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আধুনিক বিনোদন, নিরাপদ পরিবেশ এবং বৈচিত্র্যময় পর্যটন পণ্যের ঘাটতিই এর মূল কারণ। ইন্দোনেশিয়ার বালি কিংবা থাইল্যান্ডের পাতায়ার মতো গন্তব্যে বছরজুড়ে নানা আন্তর্জাতিক উৎসব ও জলক্রীড়ার আয়োজন থাকলেও কক্সবাজারের আকর্ষণ কেবল সমুদ্রসৈকত আর হোটেলের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা জানান, ২০২৫ সালে বালিতে প্রায় ৭০ লাখ বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছেন এবং পাতায়ায় অর্ধশতাধিক বৃহৎ আয়োজন হয়। অথচ কক্সবাজারে বিদেশি পর্যটকদের দীর্ঘ সময় ধরে রাখার মতো পর্যাপ্ত বিনোদনমূলক কার্যক্রমের অভাব রয়েছে।
এদিকে বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হয়রানি বন্ধ করার ওপর জোর দিয়েছেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান। তিনি উল্লেখ করেন, অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা ও নিরাপত্তার অভাবের মতো বিষয়গুলো বিদেশি পর্যটকদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শুধু অবকাঠামো বা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কিংবা রেল যোগাযোগ চালু হওয়াই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন ট্যুরস অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের সভাপতি আনোয়ার কামাল। তার মতে, সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, সহজ ভিসা নীতি, প্রশিক্ষিত কর্মী এবং টেকসই বৈশ্বিক প্রচারণার মাধ্যমেই কেবল কক্সবাজারকে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক গন্তব্যে রূপ দেওয়া সম্ভব।
দিনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা শেষে পর্যটকদের রাতের সময় কাটানোর জন্য নিরাপদ ও বৈধ বিনোদনের সুযোগও কক্সবাজারে অত্যন্ত সীমিত। সম্প্রতি একটি রেস্তোরাঁয় ডিজে নাইটকে কেন্দ্র করে পুলিশি অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, পর্যটকদের রাতের বিনোদনের একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকা জরুরি। অপরাধ দমনের পাশাপাশি আইনসম্মত বিনোদনের সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখাও সমানভাবে প্রয়োজন।
শুধু শহর বা সৈকত নয়, বরং হিমছড়ি, ইনানী, পেচারদ্বীপ, পাটুয়ারটেক, রামু, টেকনাফ, মহেশখালী ও সোনাদিয়ার মতো ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সম্ভাবনাময় এলাকাগুলোকে সমন্বিত পর্যটন পণ্যের আওতায় আনার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কক্সবাজার গন্তব্য উন্নয়ন পরিকল্পনা ২০২৫–২০২৭-এ এসব এলাকার কথা বলা হলেও যাতায়াত, আবাসন ও স্যানিটেশনের মতো মৌলিক সেবার ঘাটতি রয়ে গেছে। এর পাশাপাশি পরিবেশদূষণ ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও বহুজাতিক পর্যটনের পথে বড় অন্তরায়। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয় এবং অধিকাংশ হোটেলের পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার না থাকায় তা সাগরে মিশছে, যা টেকসই পর্যটনের জন্য হুমকি।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ৬০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক এখানে আসেন এবং ১২ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। তবে বিদেশি পর্যটকদের নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ও তাদের গড় অবস্থানকাল বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া বৈশ্বিক বাজারে ভালো অবস্থান তৈরি করা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটন খাতের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করে একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে কক্সবাজারকে বিশ্বমানের আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়।