মিয়ানমারের সংঘাতকবলিত রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর চালানো নির্মম এক বিমান হামলায় কমপক্ষে ৩৩ জন নিরীহ বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেশ দূরে একটি জনবহুল বাজার এলাকায় এই আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক হামলার ঘটনা ঘটে, যা দেশটিতে চলা দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতাকে আরও চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাখাইন রাজ্যের উত্তরভাগের নদী তীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ শহর কিয়াউকটাও-এর একটি বাজার সংলগ্ন এলাকায় এই রক্তক্ষয়ী বিমান হামলার ঘটনা ঘটে। ওই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণকারী প্রভাবশালী সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি এবং স্থানীয় ত্রাণকর্মীরা এই মর্মান্তিক মৃত্যুর সংখ্যা নিশ্চিত করেছেন। এই নৃশংস হামলায় ঘটনাস্থলেই ৩৩ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং আরও অন্তত ৩৬ জন গুরুতর আহত হয়ে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয় একটি ত্রাণ দলের দায়িত্বে থাকা ওয়াই হুন আং সংবাদমাধ্যমকে জানান, যে জনবহুল স্থানটিতে এই বর্বরোচিত বিমান হামলা চালানো হয়েছে, সেটি মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেকটাই দূরে অবস্থিত। এমনকি চলমান সশস্ত্র সংঘাত বা সম্মুখ সমর গণ্ডির সাথে ওই এলাকার কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র বা সংশ্লিষ্টতা ছিল না। অথচ সম্পূর্ণ নিরপরাধ সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসে এই আকাশ থেকে মৃত্যু।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই পুরো মিয়ানমার জুড়েই এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ চলছে। দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে অবৈধ সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে অত্যন্ত সুসংহতভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে আরাকানডিসহ বিভিন্ন শক্তিশালী সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী। তবে সাধারণ মানুষের ওপর চালানো এই ভয়াবহ বিমান হামলার বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের সামরিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এর আগে সামরিক বাহিনীর তরফ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছিল যে, বেসামরিক লোকজনের অপ্রয়োজনীয় ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি এড়াতে তারা অপারেশন পরিচালনার সময় সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক এই ব্যাপক হতাহতের ঘটনা তাদের সেই দাবির সত্যতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, বিগত ডিসেম্বরে রাখাইনের একটি স্থানীয় হাসপাতালের ওপর চালানো প্রাণঘাতী বিমান হামলার ঘটনার পর এটিই এই ভূখণ্ডে ঘটা সবচেয়ে ভয়াবহ ও মর্মান্তিক বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনা। যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে দিন দিন যেভাবে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে, তা কেবল অভ্যন্তরীণ সংকটকেই তীব্র করছে না, বরং সমগ্র অঞ্চলে এক চরম মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।
বিশ্লেષকরা মনে করছেন, যুদ্ধের ময়দানে কোণঠাসা হয়ে পড়া সামরিক জান্তা সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে এ ধরনের বিমান হামলা চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে বারবার যুদ্ধবিরতি ও বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হলেও জান্তা সরকার তা ক্রমাগত উপেক্ষা করে চলেছে। এই নির্বিচার হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে স্থানীয় বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানিয়েছে তারা।
সূত্র: রয়টার্স