মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যেই চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা মাথায় নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে ফিরেছে ইরানি শিশুরা। তবে গত বিমান হামলার ধ্বংসলীলা আর স্বজন হারানোর ক্ষত এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। দীর্ঘ বিরতি ও অনলাইন ক্লাসের পর নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হলেও ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের মিনাবসহ কয়েকটি প্রদেশে এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি শিক্ষাব্যবস্থা। চরম নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে দেশটির শিক্ষা কর্তৃপক্ষ প্রথম দুই সপ্তাহ স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস অনলাইনে চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যুদ্ধাবস্থার কারণে গত বছর থেকেই শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছিল।
স্মরণ করা যেতে পারে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার প্রথম দিনেই মিনাবের শাজারেহ-ই তাইয়্যেবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের এলাকায় ভয়াবহ বোমা বর্ষণ করা হয়। ওই মর্মান্তিক হামলায় অন্তত ১২০ জন শিশু ও ৩৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছিলেন। ঘটনার পর দীর্ঘ সময় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় প্রশাসন। যদিও বোমা হামলায় ধ্বংস হওয়া স্কুলটির জায়গায় ইতিমধ্যে নতুন আধুনিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, তবুও সেখানে কাটেনি আতঙ্ক। শিক্ষার্থীরা সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ক্লাসে অংশ নিয়ে ছুটির ঘণ্টা বাজার সাথেই দ্রুত বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।
এদিকে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠায় রয়েছেন অভিভাবকরা। রাজধানী তেহরানের এক শিক্ষার্থীর বাবা মেইসাম সংবাদমাধ্যমকে জানান, হঠাৎ করে ফের যুদ্ধ শুরু হলে স্কুল থেকে সন্তানকে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে আনতে কতটা সময় লাগবে, সেই চিন্তায় তিনি সবসময় তটস্থ থাকেন। অন্যদিকে, মিনাব এলাকার শিক্ষক ফারামার্জ এই হামলায় তার স্ত্রী ও এক সন্তানকে চিরতরে হারিয়েছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, চার সদস্যের একটি পরিবারের অর্ধেক অংশ আজ নেই। স্কুলগুলো পুনরায় খুললেও তাদের ব্যক্তিগত জীবনে আগের সেই স্বাভাবিকতা আর কখনো ফিরে আসবে না।
ইরানের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের এই পুরো সময়ে দেশটির মোট ১ হাজার ২৮৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অনেক স্কুল মেরামত ও সংস্কার করার পাশাপাশি নতুন শ্রেণিকক্ষও তৈরি করা হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে অনলাইনভিত্তিক পাঠদান চলায় শিক্ষাক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এক শিক্ষক জানান, বিগত শিক্ষাবর্ষের নয় মাসের মধ্যে দীর্ঘ চার মাসই ক্লাস করতে হয়েছে অনলাইনে। ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার নিবিড় বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখা দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া, যেসব অঞ্চলে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তি সুবিধা পর্যাপ্ত নয়, সেখানকার শিশুরা শিক্ষাজীবন থেকে আরও বেশি পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা