বাবাকে ঘিরে এক অবুঝ শিশুর বুকফাটা কান্না ও আকুতির দৃশ্য নাড়া দিয়েছে গোটা দেশকে। মিথ্যা চুরির অপবাদ দিয়ে এক ব্যক্তিকে মধ্যরাতে বেঁধে রেখে নির্যাতনের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। তবে এর চেয়েও বেশি হৃদয়বিদারক হয়ে উঠেছে বাবার কষ্ট দেখে ছোট্ট এক শিশুর প্রতিবাদ ও ভালোবাসার মুহূর্তটি।
ঘটনাটি বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার বামরাইল এলাকার। গত শনিবার মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিক সরদার নামের এক ব্যক্তিকে চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এই পাশবিক ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ভাইরাল হয়। ভিডিওটিতে দেখা যায়, নির্যাতনের শিকার হয়ে অসহায়ভাবে বেঁধে থাকা বাবার মুখে নিজ হাতে চা ও রুটি তুলে দিচ্ছে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তার আদরের মেয়ে তুবা বিনতে অরণি। বাবার ওপর হওয়া এই অন্যায়ের প্রতিকার চেয়ে ছোট্ট তুবার কান্নার দৃশ্য নাড়া দিয়েছে লাখো মানুষকে।
স্কুলছাত্রী তুবা জানায়, রাতের গভীরে খবর পেয়ে সে তার মা জান্নাত ও ছোট বোনকে নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। সেখানে গিয়ে সে দেখতে পায় বাবাকে লাঠি দিয়ে পেটানো হচ্ছে। এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তুবা হামলাকারীদের বাবাকে ছেড়ে দেওয়ার আকুতি জানায়। কিন্তু পাষণ্ডরা তাতে কর্ণপাত করেনি। উল্টো ক্ষুধার্ত বাবার কষ্ট দেখে সে নিজ হাতে চা ও রুটি খাইয়ে দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয়দের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো সুরাহা মেলেনি।
সোমবার দুপুরে উজিরপুর উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় নির্যাতনের শিকার অনিক সরদারকে উন্নত চিকিৎসার জন্য মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। অনিক সরদার দাবি করেন, পূর্বশত্রুতা ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাকে পরিকল্পিতভাবে এই হেনস্তা করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে চুরির কোনো প্রমাণ তারা দেখাতে পারেনি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মেয়ের সামনে এমন মর্মান্তিক দৃশ্য দেখার চেয়ে তার মৃত্যু অনেক ভালো ছিল।
তুবার মা জান্নাত জানান, খবর পেয়ে তুবা খালি পায়েই দৌড়ে বাবার কাছে গিয়েছিল। স্থানীয় অনেকে ভিডিও করে মজা নিলেও কেউ তাদের কথা শোনেনি। প্রথমে কিছু লোক তাদের গ্রামছাড়া করতে চাইলেও পরবর্তীতে প্রশাসন কঠোর হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে যায়।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা জানান, ঘটনাটি জানার পরই তিনি ভুক্তভোগী পরিবারটির পাশে দাঁড়ান। অনিকের সুচিকিৎসার জন্য সোমবার তাকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। আগামী তিন মাস তার পরিবারের ভরণপোষণসহ সার্বিক সহযোগিতা করবে উপজেলা প্রশাসন। এছাড়া অনিককে পাঠানোর সময় উজিরপুর উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি এসএম আলাউদ্দিন সাহেব নগদ অর্থ দিয়ে পরিবারটিকে সহায়তা করেন। প্রশাসনের এমন উদ্যোগে স্বস্তি ফিরেছে পরিবারটিতে। এখন সুস্থ হয়ে অনিকের ঘরে ফেরার প্রতীক্ষায় রয়েছে ছোট্ট তুবা।