কুমিল্লার হোমনা থেকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে মেঘনা নদীর শাখা নদীতে সংঘটিত মর্মান্তিক ট্রলারডুবির ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে পাঁচজনে দাঁড়িয়েছে। দুর্ঘটনার চার দিন পর নদী থেকে নিখোঁজ হেলাল উদ্দিন (৫৪)-এর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর ফলে ওই দুর্ঘটনায় একই পরিবারের চার সদস্যসহ মোট পাঁচজনের প্রাণহানির নিশ্চিত খবর পাওয়া গেল এবং বর্তমানে এই ঘটনায় আর কোনো নিখোঁজ ব্যক্তি নেই বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সোনারগাঁও উপজেলার বৈদ্যেরবাজার এলাকার মেঘনা নদীর শাখা নদী মারিখালীর রতনপুর ব্রিজের নিচ থেকে হেলাল উদ্দিনের মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। বৈদ্যেরবাজার নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক শাহ কামাল গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, উদ্ধারকৃত মরদেহটি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে পুলিশের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই দুর্ঘটনাজনিত একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এর আগে গত শুক্রবার রাতে ও শনিবার সকালে সোনারগাঁওয়ের মেঘনা নদী থেকে নিখোঁজ একই পরিবারের তিন ভাইবোনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ওই তিন ভাইবোন হলো হেলাল উদ্দিনের ১৭ বছর বয়সী মেয়ে সামিয়া আক্তার, ২৪ বছর বয়সী ছেলে সজীব হোসেন এবং ৫ বছরের শিশু সামিন হোসেন। এছাড়া দুর্ঘটনা সংঘটিত হওয়ার দিনেই রাশিদা বেগম (৪০) নামের অপর এক নারীর মরদেহও উদ্ধার করা হয়েছিল। নিহত এই পরিবারের সকলে মূলত কুমিল্লার হোমনা উপজেলার শ্রীমদ্দি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন বলে জানা গেছে।
নৌ পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে প্রাপ্ত বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বিকেলে কুমিল্লার হোমনার শ্রীমদ্দি গ্রাম থেকে সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত হাড়িয়া বৈদ্যপাড়া গ্রামের শাহ পরানের মেয়ে সাজিয়া আক্তারের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি ট্রলারে চড়ে রওনা হন মোট ১৩ জন আত্মীয়স্বজন। আনন্দঘন ওই যাত্রার ট্রলারটিতে যাত্রী ছাড়াও দুটি গরু ও একটি খাসি বোঝাই করা ছিল। পথিমধ্যে সোনাময়ী এলাকায় অবস্থিত আমান সিমেন্ট কোম্পানির কারখানার কাছাকাছি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই আবহাওয়া হঠাৎ খারাপ হয়ে তীব্র ঝড়ো বাতাস শুরু হয়। উত্তাল নদীতে বড় বড় ঢেউয়ের সৃষ্টি হলে ট্রলারটির ভেতর দ্রুত পানি উঠতে শুরু করে এবং মুহূর্তের মধ্যে সেটি নদীতে তলিয়ে যায়।
দুর্ঘটনার পরপরই নিকটবর্তী স্থানে থাকা আমান সিমেন্ট কারখানার একটি উদ্ধারকারী ট্রলার দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে আটজন যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। ঘটনার প্রায় আধা ঘণ্টা পর নদী থেকে রাশিদা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে সে সময় আরও চারজন নিখোঁজ ছিলেন। পরবর্তী সময়ে একে একে তিন ভাইবোনের মরদেহ উদ্ধার করা হলেও বাবা হেলাল উদ্দিন নিখোঁজ ছিলেন। সোমবার তার মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘটে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ট্রলারডুবির এই মারাত্মক দুর্ঘটনার মূল কারণ ছিল ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ও গবাদিপশু বহন করা। ছোট ওই নৌযানে ১৩ জন যাত্রী এবং তিনটি গবাদিপশু একসঙ্গে তোলার ফলে নদীর বৈরী আবহাওয়ায় ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। এছাড়া স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ রয়েছে যে, দুর্ঘটনার সময় একটি নৌযান সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে চাইলেও ট্রলারের মাঝি কোনো ধরনের সহায়তা গ্রহণ করেননি, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।