দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতের লাখো উদ্যোক্তা ব্যাংক হিসাব খোলা ও ঋণ প্রাপ্তি নিয়ে এক জটিল সংকটের মুখে পড়েছেন। চলতি অর্থবছরে ভ্যাটের পরিধি বাড়াতে ব্যাংকিং লেনদেন ও ঋণ গ্রহণে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার বা বিআইএন বাধ্যতামূলক করার পর থেকেই শুরু হয়েছে এই অচলাবস্থা। এই শর্ত শিথিল বা বাতিলের দাবি জানিয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শীর্ষ সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)। তবে আইনি বাধ্যবাধকতার যুক্তি দেখিয়ে সেই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ফলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই উৎপাদন ও সেবা খাতকে কেন্দ্র করে দুই শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তৈরি হয়েছে মুখোমুখি অবস্থান।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কর কাঠামোর আওতা সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর সরকারের সুদূরপ্রসারী কৌশলের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাটের ভিত্তি প্রশস্ত করতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়াকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, যা পরবর্তীতে অর্থ বিলে যুক্ত হয়ে আইনে রূপ নেয়। বর্তমান আইনি বিধান অনুযায়ী, যেকোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চলতি হিসাব কিংবা শর্ট-টার্ম ডিপোজিট বা এসটিডি হিসাব পরিচালনা এবং নতুন ঋণ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিআইএন উপস্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শুধু ব্যাংক লেনদেন নয়, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা, বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ এবং বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)-তে কোম্পানির নামে যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও এই পরিচয় নম্বর প্রদর্শন এখন আব্লিক। এনবিআরের সাফ কথা, আইন সবার জন্য সমান এবং অর্থনীতির স্বচ্ছতা আনতে এই কঠোরতার কোনো বিকল্প নেই।
অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোর্চা এবিবির মতে, মাঠপর্যায়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বিবেচনা না করে রাতারাতি এমন কঠোর শর্ত আরোপ করায় পুরো খাতে স্থবিরতা নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত ১৭ আগস্ট এবিবির পক্ষ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল। সংগঠনটির দাবি ছিল, কুটির, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যাংক হিসাব খোলা এবং যেকোনো ধরনের ঋণ বা ক্রেডিট সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিআইএন নিবন্ধনের প্রমাণ দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হোক। পাশাপাশি, এই ছাড় বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত সিএমএসএমই গ্রাহকদের জন্য বিআইএন দাখিলের সময়সীমা যৌক্তিকভাবে বাড়ানো এবং প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে ও পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করার অনুরোধ জানানো হয়। উদ্যোক্তাদের ট্রেড লাইসেন্স বা অন্যান্য ব্যবসার নিবন্ধনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং প্রয়োজনে বিদ্যমান ব্যাংকিং রেকর্ডকে সহায়ক প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয় ব্যাংকগুলো।
এবিবি’র এই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে গত ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তরফ থেকে লিখিত জবাবে জানানো হয় যে, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা-৪-এর উপধারা (৩)-এর দফা (ক) ও (খ) অনুযায়ী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব খোলা এবং ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিআইএন প্রদর্শন আইনগতভাবেই বাধ্যতামূলক। ফলে আইন সংশোধন বা ব্যত্যয় ঘটানোর কোনো সুযোগ তাদের হাতে নেই। এনবিআরের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন যেসব প্রতিষ্ঠান অতীতে বিআইএন ছাড়াই হিসাব পরিচালনা শুরু করেছে, তাদেরকে দ্রুত ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য উৎসাহিত করা হয়। একইসঙ্গে নতুন হিসাব খোলার সময় বিআইএন যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কঠোরভাবে অনুসরণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে ব্যাংকগুলোও এখন যেকোনো নতুন হিসাব খোলা বা ঋণ মঞ্জুর করার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে।
অর্থনীতিতে সিএমএসএমই খাতের অবদান এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে এর ঝুঁকির বিষয়টি পরিসংখ্যানেও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে সক্রিয় অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২টি। এর মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের অন্তর্ভুক্ত। সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মাইক্রো উদ্যোক্তা রয়েছে প্রায় ৬৬ লাখ ৩১ হাজার, কুটির শিল্প প্রায় ৪৫ লাখ ৩৩ হাজার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রায় ৪ লাখ ৯২ হাজার, মাঝারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩৬ হাজার এবং বড় বা বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯ হাজারের কম। দেশের মোট শিল্প খাতের কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ বা ৩ কোটিরও বেশি মানুষের রুটি-রুজির সংস্থান হয় এই খাত থেকে। জাতীয় জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ২৫ থেকে ৩২ শতাংশের মধ্যে। অথচ এত বিশাল এক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো বিআইএন নিবন্ধনের বাইরে অবস্থান করায় ব্যাংকিং কার্যক্রমে মারাত্মক বাধার মুখে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাঠপর্যায়ের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিগত ও দাপ্তরিক জটিলতা এবং সচেতনতার অভাবকে আমলে না নিয়ে হুট করে এমন কঠোর আইন প্রয়োগ করলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। এতে একদিকে যেমন ঋণপ্রবাহ ব্যাহত হয়ে উৎপাদনমুখী অর্থনীতিতে ধীরগতি আসবে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এনবিআরের রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্য এবং ব্যাংক খাতের ঋণ বিতরণের বাস্তবতার মধ্যে একটি সুষম ও জনবান্ধব সমাধান খুঁজে না পেলে দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত এই এসএমই খাত বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।