আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন থেকে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার ছাড়াই সরাসরি দেশীয় মুদ্রা টাকায় আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের যাবতীয় আর্থিক লেনদেন নিষ্পত্তি করার সুযোগ উন্মুক্ত করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমার পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যে এক নতুন গতির সঞ্চার হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি জরুরি ও নির্দেশনা জারি করেছে। নতুন এই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এখন থেকে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নামে পরিচালিত নন-রেসিডেন্ট টাকা বা ভোস্ট্রো (Vostro) হিসাবের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি লেনদেনের সমস্ত অর্থ টাকায় পরিশোধ বা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, আমদানিকারকের কাছ থেকে পরিশোধিত অর্থ প্রথমে সংশ্লিষ্ট ভোস্ট্রো হিসাবে জমা হবে। পরবর্তীতে ওই হিসাবের মাধ্যমে সরাসরি বাংলাদেশের কোনো রপ্তানিকারকের অনুকূলে পাওনা অর্থ পরিশোধ করা যাবে। তবে বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে এলসি (ঋণপত্র), বাণিজ্যিক চুক্তি বা ইনভয়েস পূর্বের নিয়মানুযায়ী অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রায় সম্পন্ন করতে হবে। পরবর্তীতে প্রচলিত বিনিময় হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সেই হিসাবের অর্থ টাকায় রূপান্তর করে লেনদেন নিষ্পত্তি করা যাবে।
অন্যদিকে, যেসব রপ্তানিকারক তাদের রপ্তানি আয়ের অর্থ দেশীয় টাকায় গ্রহণ করবেন, তারা চাইলে বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের বিশেষ সুবিধাও পাবেন। সংগৃহীত এই বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল কাঁচামাল আমদানি, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল বা ইডিএফ (EDF) ঋণ পরিশোধসহ অনুমোদিত যেকোনো বৈদেশিক মুদ্রার দায়দেনা মেটানোর কাজে ব্যবহার করা যাবে। একই সঙ্গে ভোস্ট্রো হিসাবে জমা থাকা উদ্বৃত্ত বা অতিরিক্ত অর্থ সরাসরি বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI), বৈদেশিক পোর্টফোলিও বিনিয়োগ, বিকল্প বিনিয়োগ তহবিল এবং ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের মতো লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করা যাবে। পাশাপাশি, যথাযথ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে বাংলাদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রেও এই তহবিল ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এদিকে একই দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জারি করা অন্য আরেকটি পৃথক নির্দেশনায় এক্সচেঞ্জ হাউস এবং মানি ট্রান্সফার বা আইএমটিও-এর মাধ্যমে দেশে আসা প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রার রেমিট্যান্স আরও সহজ করা হয়েছে। এখন থেকে এই রেমিট্যান্সের অর্থ প্রাইভেট ফরেন কারেন্সি বা পিএফসি (PFC) এবং নন-রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট বা এনএফসিডি (NFCD) হিসাবে জমা রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব আর্থিক লেনদেন পরিচালনার ক্ষেত্রে গ্রাহক পরিচিতি বা কেওয়াইসি (KYC), মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ সংক্রান্ত এএমএল/সিএফটি (AML/CFT) নীতিমালা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যান্য বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা বিধিমালা ও রিপোর্টিংয়ের সব শর্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।