ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এনপিটি থেকে সরে না দাঁড়াতে ইরানকে রাশিয়ার আহ্বান


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সময় : ৭:১১ পিএম

পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি থেকে তেহরান যাতে কোনোভাবেই সরে না দাঁড়ায়, সেই জোরালো আহ্বান জানিয়েছে অন্যতম মিত্র দেশ রাশিয়া। বৈশ্বিক এই পরমাণু কাঠামোর প্রতি সম্মান জানিয়ে ইরানকে চুক্তিটির একজন দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে মস্কো। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যখন নতুন করে উত্তেজনা দানা বাঁধছে, ঠিক সেই মুহূর্তে রুশ প্রশাসনের এই বার্তা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।


সম্প্রতি ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক বক্তব্যে স্পষ্ট করেন যে, ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, সে বিষয়ে তেহরানের আরও স্পষ্ট অবস্থান জানানো প্রয়োজন। তবে যেকোনো মূল্যে মস্কো চায় না ইরান এই আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিক। পেসকভ জোর দিয়ে বলেন, বৈশ্বিক পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো এই চুক্তি। তাই রাশিয়া আন্তরিকভাবে আশা করে যে, তেহরান এই চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবেই বহাল থাকবে।


রাশিয়ার পক্ষ থেকে এমন সময় এই আহ্বান এসেছে, যখন খোদ ইরানের অভ্যন্তরেই এনপিটি থেকে নাম প্রত্যাহারের বিষয়টি জোরালো আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার আলী নিকজাদের সাম্প্রতিক বিবৃতির বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে আসার একটি প্রস্তাব দ্রুততার সঙ্গে সংসদে তোলার চিন্তা চলছে। এই প্রস্তাবটি ‘ট্রিপল-আর্জেন্সি’ বা বিশেষ দ্রুতগতির প্রক্রিয়ায় সংসদে উপস্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ সংসদীয় প্রক্রিয়ার চেয়ে অনেক কম সময়ে আলোচনা ও ভোটাভুটির সুযোগ তৈরি করে।


এদিকে ইরানের আইনপ্রণেতাদের একটি অংশ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ-এর ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের কড়া অভিযোগ, সংস্থাটি এবং এর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছেন। তবে ইরানের নীতিগত অবস্থানে এখনও বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সম্প্রতি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, তেহরান কখনোই পরমাণু অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছে না। তাছাড়া এনপিটি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দেশটির রাজনৈতিক মহলে এখনও একক কোনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি। অনেক রাজনীতিক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, চুক্তিটি ত্যাগ করলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ আরও তীব্র হতে পারে, যা দেশটির পজিশনকে দুর্বল করবে।


১৯৭০ সালে কার্যকর হওয়া এনপিটি বিশ্বজুড়ে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধের প্রধান আন্তর্জাতিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এর অধীনে সদস্য রাষ্ট্রগুলো পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার ঠেকানোর পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরমাণু প্রযুক্তি ব্যবহারের শর্ত মেনে চলে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে, তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ পুরো কর্মসূচিটি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও পশ্চিমা দেশগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মনে তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাশা নিয়ে সন্দেহ কাটেনি।


কূটনৈতিক মহলের মতে, বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যকার সুসম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বিশেষ করে ইউক্রেন সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে দুই দেশ একে অপরের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। ২০২৫ সালে মস্কো ও তেহরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও মজবুত করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এবং ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বৈঠক করে বর্তমান সংকট নিরসনে কূটনৈতিক আলোচনার ওপর সর্বাধিক জোর দিয়েছেন। এর আগে রাশিয়া, চীন ও ইরান যৌথভাবে আইএইএর বৈঠকে তেহরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচির অধিকারকে সমর্থন জানিয়েছিল।


বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান যদি শেষ পর্যন্ত এনপিটি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন ভূরাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আইএইএ-র সঙ্গে সম্পর্ক এবং তেহরানের পরমাণু ভবিষ্যৎ এক অনিশ্চিত মোড়ের দিকে ধাবিত হবে। তবে এখন পর্যন্ত ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো চরম সিদ্ধান্ত নেয়নি। বিষয়টি কেবল সংসদীয় ও রাজনৈতিক আলোচনার গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ক্রেমলিনের সর্বশেষ অবস্থান থেকে এটি পরিষ্কার যে, মস্কো যেকোনো মূল্যে তেহরানকে আন্তর্জাতিক কাঠামোর ভেতরেই ধরে রাখতে চায়।

সূত্র: আল-জাজিরা


এ সম্পর্কিত আরো খবর