ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাখাইনের বাজারে বিমান হামলা: প্রাণ গেল ৪৯ জনের, আহত ৫৮


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সময় : ১০:৩৬ এএম

 

মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধে রক্তাক্ত হলো রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকতাও শহর। দেশটির সামরিক জান্তার বিমান বাহিনীর চালানো এক আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক বোমাবর্ষণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪৯ জন সাধারণ মানুষ। ব্যস্ততম একটি বাজারে সংঘটিত এই নিষ্ঠুর হামলায় আহত হয়েছেন আরও ৫৮ জন, যাদের মধ্যে অন্তত ২২ জনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে জানা গেছে।

 

গত ২৮ সেপ্টেম্বর, সোমবার এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। যে অঞ্চলে এই বিমান হামলা চালানো হয়েছে, সেটি মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ঘটনার পর আরাকান আর্মির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়, সোমবার বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান কিয়াউকতাও শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ওই পাইকারি মার্কেটের ওপর সুনির্দিষ্টভাবে দুটি বোমা বর্ষণ করে। মুহূর্তের মধ্যে গোটা এলাকা ধোঁয়া ও আগুনে ঢেকে যায়।

 

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ভয়াবহ বিমান হামলায় হতাহত হওয়া ব্যক্তিরা প্রত্যেকেই বেসামরিক নাগরিক। তাদের মধ্যে কিছু অংশ ছিলেন বাজারের অস্থায়ী দোকানদার, কিছু অংশ স্থায়ী ব্যবসায়ী এবং বাকিরা কেনাকাটা করতে আসা সাধারণ পথচারী বা ক্রেতা। রাখাইনের বেসামরিক প্রতিরক্ষা ও উদ্ধারকারী দলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ওয়াই হুন অং সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আরাকান আর্মির পক্ষ থেকে প্রকাশিত হতাহতের সংখ্যা সম্পূর্ণ সত্য। তিনি বলেন, কিয়াউকতাওয়ের এই পাইকারি বাজারটিতে সবসময় প্রচুর লোকসমাগম হতো। রাখাইনের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খুচরা ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতারা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে প্রতিদিন এই বাজারে ভিড় করতেন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন দৃশ্য ও ভিডিও ফুটেজে হামলার ভয়াবহতার চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। প্রকাশিত সেসব দৃশ্যে দেখা যায়, কিয়াউকতাও শহরের ওই বাজার এবং তার আশেপাশের বেশ কয়েকটি আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন, বাস এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে বিধ্বংসী আগুন জ্বলছে। শুধু বাজারটিই নয়, বিমান বাহিনীর ছোড়া বোমার আঘাতে বাজারসংলগ্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছে।

 

উল্লেখ্য, রাখাইনভিত্তিক আরাকান আর্মি হলো মিয়ানমারের অন্যতম বৃহৎ ও শক্তিশালী সেনাবিরোধী সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী। দীর্ঘ বহু বছর ধরে এই সংগঠনটি রাখাইন অঞ্চলের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি ও তার দলীয় সরকারকে হটিয়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। এরপর থেকেই দেশের সাধারণ মানুষের তীব্র সেনাবিরোধী মনোভাবকে কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সাংগঠনিক বিস্তার ও সামরিক শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে নেয় আরাকান আর্মি।

 

পরবর্তীতে ২০২৩ সালে রাখাইন প্রদেশের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের মুঠোয় নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ও চূড়ান্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী। দীর্ঘ এই লড়াইয়ের ফলস্বরূপ, বর্তমানে রাখাইনের মোট ১৭টি শহরের মধ্যে ১৪টি শহরই সম্পূর্ণভাবে আরাকান আর্মির দখলে রয়েছে। আজকের এই হামলার শিকার হওয়া কিয়াউকতাও শহরটিও এই চৌদ্দটি মুক্তাঞ্চল বা বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত শহরেরই একটি। ফলে এই অঞ্চলে বিমান বাহিনীর এমন নির্বিচার আক্রমণ নতুন করে বড় ধরনের উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।

সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ইন্ডিয়া টুডে

 


এ সম্পর্কিত আরো খবর