স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি চিরতরে রোধ করতে কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে অর্থাৎ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না—এমন বিধানের পক্ষে নিজেদের সুদৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে সরকার। সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক শেষে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
গত রবিবার ও মঙ্গলবার—টানা দুই দিনব্যাপী দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, টেলিভিশন ও অনলাইন পোর্টালের প্রধান, বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং শীর্ষ সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময় করে সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটি। সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মতবিনিময়কালে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও সংবাদকর্মীদের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা জমা পড়েছে।
সাংবাদিকদের এক সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পরিষ্কার করে জানান, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত করার প্রস্তাবটিকে কেউ কেউ অগণতান্ত্রিক বা জনগণের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী বলে মত প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, দেশে একনায়কতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্রের জন্ম নেওয়া ঠেকাতেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এই যুগোপযোগী প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। সরকার তার সেই অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেনি। তবে জাতীয় সংসদে যদি বিরোধী দল বা অন্য কোনো মহলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ভিন্ন কোনো বিকল্প প্রস্তাব আসে, তবে তা নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সংবিধানের অন্যান্য সম্ভাব্য সংশোধনীর বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, চলমান বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি পুনর্বহাল, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও বিকেন্দ্রীকরণ, এবং সংবিধানের প্রস্তাবনা তথা প্রিয়াম্বল ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিবর্তনের নানা প্রস্তাব উঠে এসেছে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ও কাঠামো কেমন হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। এ বিষয়ে আরও ব্যাপক ও উন্মুক্ত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে, যা পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে বিশদভাবে বিবেচনা করা হবে।
দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি একক রাষ্ট্র বা ইউনিটারি গভর্নমেন্ট, যেখানে কোনো অঙ্গরাজ্যের বা প্রাদেশিক ব্যবস্থার সুযোগ নেই। এই প্রেক্ষাপটে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থার আদৌ কোনো প্রয়োজন রয়েছে কি না, তা নিয়ে বৈঠকে কিছু প্রশ্ন ও মতামত উত্থাপিত হয়েছে। তবে ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ যেহেতু দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট গঠনের বিষয়ে একটি রাজনৈতিক ঐকমত্য রয়েছে, তাই সরকার সে পথেই এগিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। এ বিষয়ে চূড়ান্ত ও সর্বময় সিদ্ধান্ত একমাত্র সংসদই গ্রহণ করবে।
সংবিধানে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ এবং ‘জুলাই সনদ’-এ তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতের প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার দরজা সর্বদা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। গণমাধ্যমের মাধ্যমে তিনি বিরোধী দলগুলোকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার এবং আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানান। জুলাই সনদের কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে যদি তাদের কোনো ভিন্নমত বা আপত্তি থাকে, তবে তা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব। তবে তার জন্য বিরোধী দলগুলোকে অবশ্যই আন্তরিকতার সঙ্গে সংলাপে অংশ নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।