ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের দীর্ঘ ও বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে আলবেনিয়ার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য এখন একেবারে দৃশ্যমান বা হাতের নাগালে চলে এসেছে। বলকান অঞ্চলের এই উদীয়মান দেশটিকে ইউরোপীয় ব্লকের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ অর্জনের দৌড়ে অন্যতম শীর্ষ অগ্রগামী ও সফল প্রতিযোগী হিসেবে অভিহিত করেছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন। আলবেনিয়ার ঐতিহাসিক রাজধানী তিরানায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী এদি রামার সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলবেনিয়ার দীর্ঘ এই যাত্রাকে অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন জানান, ইউরোপীয় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে আলবেনিয়ার সরকার ও জনগণ গত কয়েক বছর ধরে অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে চলেছে। বিগত এক বছরে দেশটির অর্জিত অগ্রগতি সত্যিই প্রশংসনীয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, আলবেনিয়া সম্প্রতি তাদের আলোচনার বিভিন্ন অধ্যায়ের শেষ ক্লাস্টারগুলো সফলভাবে উন্মুক্ত করেছে। এমনকি গত জুলাই মাসে বাহ্যিক সম্পর্কসহ প্রথম তিনটি অধ্যায় সাফল্যের সঙ্গে সমাপ্ত করতে সক্ষম হয়েছে দেশটি। শুধু তাই নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাধারণ পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে আলবেনিয়া বর্তমানে শতভাগ সংগতি বজায় রেখে চলছে। দুই পক্ষই বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছে বলেও তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
তবে এত বিশাল অগ্রগতির পরেও ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান কড়া বার্তা দিয়ে বলেছেন যে, উন্মুক্ত অধ্যায়গুলোতে সংস্কারের কাজ আরও বেগবান ও কার্যকর করতে হবে। বিশেষ করে বিচার বিভাগীয় সংস্কার, নির্বাচনী কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে আরও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন, শুধু কাগজে-কলমে সংস্কারের আইন পাস করলেই চলবে না; বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রকৃত সুফল নিশ্চিত করতে এই সংস্কারগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বাস্তবভিত্তিক প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।
অন্যদিকে আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্ত হওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সব শর্ত ও মানদণ্ড পূরণে দেশটির ‘অটুট ও লোহকঠিন ইচ্ছাশক্তির’ কথা পুনর্বার ব্যক্ত করেন। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান, চলতি বছর শেষ হওয়ার আগেই আরও বেশ কিছু আলোচনা অধ্যায় সফলভাবে বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে আলবেনিয়া সরকার। দেশের ভেতরে সংঘটিত সুসংগঠিত অপরাধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “অতীতে যেখানে দুর্নীতিই একটি অলিখিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবে শিকড় গেড়েছিল, সেখানে বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা সরাসরি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।”
ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্রোথ প্ল্যান বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে উরসুলা ফন ডার লিয়েন জানান, আলবেনিয়া ইতিমধ্যে এই পরিকল্পনার আওতায় নির্ধারিত সংস্কার পদক্ষেপগুলোর ৮০ শতাংশেরও বেশি কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। এর অংশ হিসেবে দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের তহবিল থেকে ২১ কোটি ৩০ লাখ ইউরো বা প্রায় ২৪ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার আর্থিক সহায়তা লাভ করেছে এবং আগামী সপ্তাহগুলোতে আরও তহবিল প্রদান করা হবে।
এছাড়া তিনি ঘোষণা করেন যে, ইউরোপীয় কমিশন আগামী সপ্তাহে তাদের পূর্ব-সম্প্রসারণ নীতি পর্যালোচনা পেশ করবে, যা ভবিষ্যতে নতুন সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জোটে স্বাগত জানাতে ইইউর অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠান, নীতি এবং বাজেটকে পুরোপুরি প্রস্তুত করবে। তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেন যে, সদস্যপদ অর্জনের প্রক্রিয়া সবসময় সম্পূর্ণভাবে মেধাভিত্তিক হবে, তবে মেধাভিত্তিক হওয়ার মানে এই নয় যে প্রক্রিয়াটি শ্লথ বা ধীরগতির হবে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা আনোডোলু এজেন্সির সাংবাদিক বেয়জা বিন্নুর দনমেজ-এর পাঠানো এই প্রতিবেদনটি ইউরোপীয় রাজনীতিতে আলবেনিয়ার ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকেই ফুটিয়ে তুলেছে। সূত্র: আনোডোলু এজেন্সি