চট্টগ্রাম
বন্দরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিশ্বমানের সেবা
নিশ্চিত করতে টার্মিনাল পরিচালনায় বড় ধরনের কৌশলগত
পরিবর্তন এনেছে সরকার। এর অংশ হিসেবে
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি পরিচালনার
দায়িত্ব সংযুক্ত আরব আমিরাতের খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের নিকট হস্তান্তরের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সম্প্রতি
অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই টার্মিনালটির দীর্ঘমেয়াদি
পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য
১৫ বছর মেয়াদি একটি খসড়া চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিদেশি এই অপারেটরের অংশীদারত্ব
নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিভিন্ন মূল্যায়ন ও যাচাই-বাছাইয়ের
পর এই বড় পদক্ষেপ
নেওয়া হলো। ২০১৯ সালে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায়
বিভিন্ন আইনি ও নীতিগত কাঠামো
পরিবর্তনের পথ পেরিয়ে বর্তমান
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে তা চূড়ান্ত রূপ
পাচ্ছে।
অন্যদিকে,
এনসিটির পাশেই অবস্থিত চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল বা সিসিটি পরিচালনার
জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বতন্ত্র পদক্ষেপ
গ্রহণ করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক নির্দেশনার আলোকে সৌদি আরবভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল
বা আরএসজিটিকে সিসিটির অপারেটর হিসেবে নিয়োগের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটি ইতিপূর্বে
সিসিটি এবং সাধারণ কার্গো বার্থ পরিচালনার জন্য প্রায় একশ কোটি মার্কিন ডলারের বিশাল বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। যদিও পূর্বে সিসিটি পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল
উভয় পক্ষই প্রস্তাব দাখিল করেছিল, তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে আরএসজিটির প্রস্তাব ও কারিগরি মূল্যায়নকে
প্রাধান্য দিয়ে প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে
দেশের এই কৌশলগত ও
অত্যন্ত লাভজনক বন্দর টার্মিনালগুলো বিদেশি কোম্পানির হাতে দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ
করেছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম কমিটি এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। তাদের সুনির্দিষ্ট দাবি হলো, জাতীয় স্বার্থে এই টার্মিনালগুলো বিদেশি
প্রতিষ্ঠানের নিকট হস্তান্তর না করে সম্পূর্ণরূপে
দেশীয় ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হওয়া উচিত। এই আন্দোলন ও
বিরোধিতার জেরে ইতিমধ্যে বন্দর এলাকায় শ্রমিকদের পক্ষ থেকে অবস্থান ধর্মঘট ও গণ-অবস্থানের
মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। শ্রমিক নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে তাদের দাবি
উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে বন্দর কার্যক্রমে বড় ধরনের স্থবিরতা
সৃষ্টির মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সামগ্রিক
এই পরিস্থিতি প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন যে বন্দর কর্তৃপক্ষ
সম্পূর্ণভাবে সরকারি নির্দেশনা ও নীতিমালা মেনে
নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক অপারেটরদের
অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বন্দরের অপারেশনাল দক্ষতা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জনই সরকারের মূল লক্ষ্য। তবে শ্রমিক অসন্তোষ এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে এই চুক্তির বাস্তবায়ন
প্রক্রিয়া কীভাবে সামাল দেওয়া হয়, সেটাই এখন বন্দর অর্থনীতির মূল আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।