আধুনিক
প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় বিশ্বজুড়ে চাকরির বাজারে এক যুগান্তকারী ও
সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। মানুষের কাজের পরিধি ও গতি বদলে
দিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এখন
তীব্র প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে
করা জটিল ও রুটিনভিত্তিক কাজগুলো
চোখের পলকে সম্পন্ন করে দেওয়ায় বদলে যাচ্ছে প্রচলিত পেশার ধরণ ও শ্রমবাজারের সমীকরণ।
বিশ্বখ্যাত
অর্থনৈতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) সাম্প্রতিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী চার বছরের মধ্যে এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের
ফলে বিশ্বে নতুন প্রায় ১৭ কোটি কর্মসংস্থান
সৃষ্টি হবে। তবে এর বিপরীতে চাকরি
হারাতে পারেন প্রায় ৯ কোটি ২০
লাখ মানুষ। এই পরিবর্তনের ফলে
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে ডাটা এন্ট্রি, কোডিং, হিসাবরক্ষণ বা অ্যাকাউন্টিং, কাস্টমার
সার্ভিস এবং বিভিন্ন ধরনের রুটিনভিত্তিক পেশা। বৈশ্বিক এই পরিবর্তনের ঢেউ
থেকে ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশও। দেশের
শ্রমবাজারে ইতোমধ্যে এআই-এর প্রভাব পড়তে
শুরু করেছে, যেখানে এন্ট্রি লেভেলের বা প্রাথমিক পর্যায়ের
চাকরিগুলো দ্রুত দখল করে নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
তবে
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু
অন্ধকারের বার্তা নিয়ে আসেনি, বরং প্রযুক্তির সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে টিকে থাকার নতুন পথও বাতলে দিচ্ছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টিউলিপ টেকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুম মাজাদা এ বিষয়ে জানান,
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আধিক্যের কারণে আগের মতো ব্যাপক পরিসরে প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরিগুলো আর সহজলভ্য থাকছে
না। তবে কেউ যদি এআই বিষয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও তাত্ত্বিক জ্ঞান
অর্জন করতে পারেন, তবে তার জন্য চাকরির বাজার পুনরায় উন্মুক্ত হয়ে যাবে। তাই শিক্ষার্থী ও নতুন চাকরিপ্রার্থীদের
দ্রুত এই প্রযুক্তির ব্যবহার
আয়ত্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
দেশের
বৃহত্তম চাকরি খোঁজার পোর্টাল বিডজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম
ফাহিম মাশরুর মনে করেন, দেশের শ্রমবাজারের বাস্তবতায় প্রথাগত চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। প্রতিবছর দেশ থেকে প্রায় ৭ লাখ গ্র্যাজুয়েট
বা স্নাতক পাস তরুণ-তরুণী চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন। গতানুগতিকভাবে পড়াশোনা শেষ করে সরাসরি চাকুরিতে প্রবেশের পুরনো ধারণা আঁকড়ে থাকলে বেকারত্ব বাড়ার ঝুঁকি থাকবে। তাই বাস্তবমুখী ও বৃত্তিমূলক দক্ষতা
(Vocational Skills) অর্জনের
ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। যেসব ক্ষেত্রে মানুষের বাস্তবিক প্রয়োগমূলক কাজের সুযোগ রয়েছে, ভবিষ্যতেও সে সমস্ত খাতে
চাকরির পর্যাপ্ত সুযোগ বহাল থাকবে।
এদিকে
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে প্রতি চারজন কর্মীর মধ্যে অন্তত একজন কোনো না কোনোভাবে কৃত্রিম
বুদ্ধিমত্তা বা এআই-সংশ্লিষ্ট
পেশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাত ধরে একদিকে যেমন পুরনো কাজের রূপ বদলাচ্ছে, অন্যদিকে জন্ম নিচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন সব পেশা। তাই
বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছে, বর্তমানের এই লড়াই মানুষ
বনাম এআই-এর নয়, বরং
প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার এবং নতুন দক্ষতা অর্জনের লড়াই।