হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৃষ্ট অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও বিশৃঙ্খলার জেরে বিমানবন্দর থানায় দায়েরকৃত মামলায় গ্রেফতার হওয়া সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সাজানো নাটক বলে দাবি করেছেন তাঁর ছোট ছেলে সাব্বির জামান। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কার্যালয়ের সামনে এসে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি অভিযোগ করেন, দেশব্যাপী চলমান নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে শক্ত হাতে আওয়াজ তোলার কারণেই সুনির্দিষ্টভাবে তাঁর বাবাকে হেনস্তা ও হয়রানি করার হীন প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
ঘটনার মূল সূত্রপাত ঘটে গত ১ অক্টোবর বেলা পৌনে ১১টার দিকে, যখন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় সৌদি আরবের মদিনা থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটের যাত্রীদের অবতরণের পর লাগেজ ও ট্রলির তীব্র সংকট দেখা দেয়। দীর্ঘক্ষণ লাগেজ ও ট্রলি না পেয়ে ক্লান্ত ও বিরক্ত যাত্রীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সেই মুহূর্তে বিমানবন্দরের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও যাত্রী সামাল দিতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ। এই সংকটময় ও উত্তাল পরিস্থিতিতে তাঁর সঙ্গে সাবেক এমপি আখতারুজ্জামানের তীব্র বাকবিতণ্ডা ও কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।
মামলার এজাহারে আরও অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে যে, সংরক্ষিত কেপিআই এলাকায় অনুমতি ছাড়াই ভিডিও ধারণ করতে নিষেধ করায় নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিনের সঙ্গে সাবেক এই সংসদ সদস্যের হাতাহাতি ও শারীরিক লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া সাধারণ যাত্রীদের কষ্টার্জিত পবিত্র জমমের পানির বোতলের ক্ষতিসাধন এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক প্রতিনিধির সঙ্গে অত্যন্ত মারমুখী ও আক্রমণাত্মক আচরণ করার অভিযোগও যুক্ত করা হয়েছে। এই সমস্ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে বিমানবন্দর থানায় নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. শাহরিয়ার আলম সজিব বাদী হয়ে দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় একটি আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করেন।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার রাতে আটকের ঠিক আগমুহূর্তে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে জানিয়েছিলেন যে ডিবি পুলিশ তাঁকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, শুক্রবার ডিবি কার্যালয়ের সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁর ছোট ছেলে সাব্বির জামান বাবার আটকের তীব্র নিন্দা ও জোরালো প্রতিবাদ জানান। তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিপক্ষে যেকোনো যৌক্তিক প্রতিবাদ করলেই এভাবে হেনস্তা করার পুরোনো খেলা শুরু হয়। গত ১৭ বছর ধরে ঠিক যেভাবে ভিন্নমত দমনের একই ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচি চলে আসছে, বর্তমান সময়েও অবিকল সেই একই কর্মসূচি পুনরায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে তিনি চরম হতাশা প্রকাশ করেন।
সাব্বির জামান আরও উল্লেখ করেন যে, তাঁর বাবার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো পর্যালোচনা করলেই গত কয়েকদিনের লাইভ ভিডিও এবং দেওয়া বক্তব্যগুলোর সত্যতা স্পষ্ট হয়ে যাবে। জনগণের অধিকার রক্ষায় তাঁর বাবা কখনোই কোনো অন্যায় বা অপরাধ করেননি দাবি করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের নাগরিক স্বার্থের পক্ষে কথা বলার জন্যই আজ তাঁকে অযথা কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট আইনি ও ফৌজদারি অভিযোগের ভিত্তিতেই যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করা হবে। তবে দেশের একজন সাবেক আইনপ্রণেতার এমন আকস্মিক গ্রেফতার এবং পরিবারের পক্ষ থেকে আনীত রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ দেশের মূলধারার রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সচেতন নাগরিক মহলে তীব্র আলোচনার ঝড় তুলেছে। বিমানবন্দরের যাত্রীসেবার অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা এবং চরম জনদুর্ভোগের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে সৃষ্ট এই আইনি জটিলতা শেষ পর্যন্ত কোন আইনি মোড় নেয়, এখন সেদিকেই গভীর নজর রয়েছে সবার।