রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ
রূপগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীতে দীর্ঘ ১৫ বছর পর ফিরে এলো ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের চিরচেনা ও আনন্দমুখর পরিবেশ। ঢাক-ঢোল, কাড়া-নাকাড়ার আওয়াজ আর বৈঠার ছন্দে মুখরিত শীতলক্ষ্যার দুই তীরে উপচে পড়া ভিড় জমিয়েছেন লাখো মানুষ। মাদককে না বলার উদাত্ত প্রত্যয় এবং যুবসমাজকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনার স্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছে 'মামা-ভাগিনা' নৌকা।
শনিবার (৩ অক্টোবর) কাঞ্চন পৌর বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত এই বর্ণিল নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতাটি শীতলক্ষ্যার শিমুলিয়া ঘাট থেকে শুরু হয়ে কাঞ্চন বাজার ঘাট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ দেড় দশক পর এমন জমজমাট ও বর্ণাঢ্য আয়োজনের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে দিঘুলিয়া, কেরাবো, কলাতলী, বান্টি ও কাঞ্চনসহ আশপাশের পুরো এলাকায় এক অভূতপূর্ব উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিযোগিতায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২৫টি সুসজ্জিত ও আকর্ষণীয় নৌকা অংশ নেয়। দুপুরের পর থেকেই শীতলক্ষ্যা নদীর দুই তীরে নারী, পুরুষ, শিশু ও কিশোরসহ সর্বস্তরের মানুষের উপচে পড়া ঢল নামে। কেউ তীরের খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে, আবার কেউ শত শত ছোট-বড় ট্রলার ও নৌকায় ভাসমান অবস্থায় রোমাঞ্চকর এই গ্রামীণ ঐতিহ্য উপভোগ করেন।
দুপুর গড়াতেই সাপের মতো দীর্ঘ ও গতিশীল নৌকাগুলোর বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে এবং দর্শকদের উল্লাসে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে শীতলক্ষ্যার চারপাশ। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী দলগুলোর সুশৃঙ্খল সারি, মাঝিদের সমলয় গান ও ঢাকের বাদ্যে নদীর দুই পাড়ের পরিবেশ হয়ে ওঠে চিরকালের বাংলার এক জীবন্ত রূপ। টানটান উত্তেজনার এই প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়ে প্রথম স্থান অর্জন করে 'মামা-ভাগিনা' নৌকা। পাশাপাশি দ্বিতীয় স্থান দখল করে 'শেখ খোকন' এবং তৃতীয় স্থান অধিকার করে 'বুলেট' নামের নৌকাটি। এই প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কারিগররাও দীর্ঘদিন ধরে নৌকা প্রস্তুত ও দৃষ্টিনন্দন সাজসজ্জায় অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেছিলেন।
নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা শেষে সন্ধ্যায় বিজয়ীদের মাঝে জাঁকজমকপূর্ণভাবে আকর্ষণীয় পুরস্কার বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপু। তিনি প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে প্রধান পুরস্কার হিসেবে ব্র্যান্ডের নতুন মোটরসাইকেল, উন্নতমানের ফ্রিজ এবং রঙিন টেলিভিশন তুলে দেন। এ সময় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং বিপুলসংখ্যক আয়োজক কমিটির সদস্য উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাদের বক্তব্যে বলেন, বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে মাদকের মরণ নেশা থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা এবং দেশীয় ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির চর্চার কোনো বিকল্প নেই। এ ধরনের প্রাণবন্ত ও সাড়াজাগানো আয়োজন যুবসমাজকে সুস্থ বিনোদনের প্রতি আকৃষ্ট করবে এবং সামাজিকভাবে অপরাধপ্রবণতা কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। শীতলক্ষ্যার বুকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আয়োজিত এই সফল নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতাটি রূপগঞ্জের সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘ সময় ধরে একটি আনন্দদায়ক ও ঐতিহাসিক স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকবে।