লোহিত সাগরের কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুনর্দখল করতে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করেছে সৌদি আরব। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতছাড়া করতে রিয়াদ একাধিক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। আঞ্চলিক ও পশ্চিমা বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স এই তথ্য প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছয়জন প্রভাবশালী ব্যক্তি জানিয়েছেন যে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই অভিযান শুরু হতে পারে। ইয়েমেনের মাটিতে সৌদি আরবের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থাকা স্থানীয় বাহিনীগুলো মূল স্থল অভিযানে অংশ নেবে, আর তাদের নিবিড়ভাবে সহায়তা করতে আকাশপথে জোরালো হামলা চালাবে সৌদি বিমানবাহিনী। তবে সৌদির প্রধান মিত্র দেশগুলো সরাসরি কোনো যুদ্ধ অভিযানে অংশ নেবে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ইয়েমেনে সৌদি সামরিক অভিযানে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণসংক্রান্ত সহায়তা প্রদান করছে। পাশাপাশি বেশ কিছু আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশ রিয়াদকে মূলত প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।
সৌদি সামরিক নেতৃত্ব এই সম্ভাব্য অভিযানের জন্য মূলত দুটি কৌশলগত পরিকল্পনা বিবেচনা করছে বলে উপসাগরীয় ও ইয়েমেনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। প্রথম পরিকল্পনাটি অনুযায়ী, কেবল বাব আল-মানদেব প্রণালি এবং এর আশপাশের উপকূলীয় এলাকায় একটি সীমিত পরিসরের সুনির্দিষ্ট অভিযান পরিচালনা করা হবে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় পরিকল্পনাটি তুলনামূলকভাবে বেশ বিস্তৃত। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ইয়েমেনের আল-বাইদা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফ প্রদেশে একই সঙ্গে সমন্বিত ও জোরালো আক্রমণ চালানো হবে। অভিযানের সম্ভাব্য পরিসর অনুযায়ী প্রায় এক লাখের বেশি ইয়েমেনি যোদ্ধাকে এই লড়াইয়ে মোতায়েন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ধারণা করছেন।
তবে এই অভিযান ঠিক কবে নাগাদ শুরু হবে, তার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট ছয়জন ব্যক্তির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য সময়সীমা আগামী এক সপ্তাহ থেকে শুরু করে আগামী নভেম্বরের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরবর্তী সময় পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এ বিষয়ে সৌদি ও ইয়েমেন সরকার, হুতি গোষ্ঠী এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্রদের আনুষ্ঠানিক মন্তব্য চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাব আল-মানদেব প্রণালি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ হওয়ায় এটি বর্তমান ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী এই বাণিজ্যিক নৌপথটি বর্তমানে অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। কারণ, ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার ফলে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের গুরুত্ব বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি হুতি বাহিনী উপকূল ধরে দ্রুত অগ্রসর হয়ে বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কব্জায় নেওয়ায় রিয়াদ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। পশ্চিমা কূটনীতিক ও উপসাগরীয় এক কর্মকর্তা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে বহাল থাকা অবস্থায় তাদের সঙ্গে নতুন করে কোনো অর্থবহ শান্তি আলোচনা শুরু করা সম্ভব নয়।
২০১৫ সালের ইয়েমেন গৃহযুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি চায় না সৌদি আরব। সে সময় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে টিকিয়ে রাখতে রিয়াদ একটি আরব জোটের নেতৃত্ব দিয়েছিল। তবে এবারের পরিস্থিতি অনেকটাই আলাদা। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও সৌদি আরব বিশেষজ্ঞ মাইকেল র্যাটনি মনে করেন, এবারের সৌদি অভিযান আগের মতো সর্বাত্মক না হয়ে তুলনামূলকভাবে সীমিত পরিসরের হতে পারে। উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখল করে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনাই এর মূল লক্ষ্য।
এই অভিযানে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির বহুমুখী সমীকরণ দেখা যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সীমিত পরিসরে গোয়েন্দা ও উপদেষ্টা সহায়তা দিলেও, রয়টার্সের আগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সরাসরি সামরিক সহায়তা চাইলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে সম্পূর্ণ সাড়া দেননি। এর বাইরে, গত মাসে সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করা তুরস্ক ও পাকিস্তান রিয়াদকে সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে সহায়তা করছে। পাকিস্তান বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন এবং হালকা কামান এডেন বন্দরে পাঠিয়েছে এবং তাদের সামরিক উপদেষ্টারা স্থানীয় বাহিনীকে সহায়তা করছেন। তাছাড়া সৌদি সীমান্ত সুরক্ষায় পাকিস্তান ৩০ থেকে ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করলেও ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধ করার জন্য কোনো সেনা পাঠাচ্ছে না। অন্যদিকে, লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর সুরক্ষায় ফ্রান্সও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ও সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
ইয়েমেনের হুতিবিরোধী স্থানীয় বাহিনীগুলোর সক্ষমতা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। ইয়েমেনবিষয়ক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলবাশা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি ও বড় ধরনের আক্রমণাত্মক অভিযান চালানোর জন্য এসব স্থানীয় বাহিনী কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দেশটির নীতিনির্ধারণী মহলের ঘনিষ্ঠ আলি শিহাবি সতর্ক করে বলেছেন, অভিযানের সার্বিক সাফল্য মূলত ইয়েমেনের স্থলবাহিনীগুলোর কার্যক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের এই বহুমুখী বিস্তার এই অঞ্চলে নতুন এক বিশাল উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স