দেশের জ্বালানি খাতে সবুজ শক্তির প্রসার এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্যে বাগেরহাটের রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আজ বুধবার একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৯৮ কোটি ৮ লাখ টাকা।
বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবিত রামপাল ৪৪২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। এই বিশাল প্রকল্পটির আর্থিক সংস্থানের ক্ষেত্রে বিপিডিবি’র নিজস্ব তহবিল থেকে ৩৭৪ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিল থেকে ২ হাজার ১২৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা জোগান দেওয়া হবে। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন তহবিলের এই ঋণের বার্ষিক সুদের হার নির্ধারিত হয়েছে ২ শতাংশ। এ ছাড়া এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ পরিশোধের জন্য মোট ১৬ বছর সময় পাবে বাস্তবায়নকারী সংস্থা। পরিকল্পনা কমিশন ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৯ সালের মার্চের মধ্যে প্রকল্পটি সফলভাবে সম্পন্ন করার সুপারিশ করেছে।
প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি রামপালের ব্লক-বি এলাকার ৯১৮.৫০ একর জমির ওপর নির্মিত হবে। উল্লেখ্য, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ২০১২ সালে বিপিডিবি এই জমি অধিগ্রহণ করেছিল। ইতিপূর্বে জমিটি দুই ভাগে ভাগ করা হলেও ব্লক-বি অংশটি বিপিডিবি’র নিজের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ইতোমধ্যে সেখানে ভূমি উন্নয়ন ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। নিজস্ব জমি ব্যবহারের ফলে নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণের কোনো প্রয়োজন পড়ছে না, যা প্রকল্পের সার্বিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে। তাছাড়া, এই সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অতি সহজেই নিকটস্থ রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যমান সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে, যা সময় ও খরচ উভয়ই বাঁচাবে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের উৎপাদন বিভাগের সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম জানান, প্রস্তাবিত এই সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবকাঠামোকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। সৌর প্যানেলে সংগৃহীত শক্তি ইনভার্টারের সহায়তায় এসি বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়ে সরাসরি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এই কেন্দ্রে সর্বনিম্ন ৬৪০ ওয়াট পিক ক্ষমতার সৌর ফটোভোলটাইক মডিউল ব্যবহার করা হবে। এর পাশাপাশি ৩৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্রিড-টাইড ইনভার্টার, একটি পুলিং সাবস্টেশন, তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ডাবল-সার্কিট ২৩০-কেভি সঞ্চালন লাইন এবং প্রয়োজনীয় বে স্থাপন করা হবে। প্রকল্পের অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ২৩৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয় হবে সৌর ফটোভোলটাইক মডিউল ও মাউন্টিং স্ট্রাকচার ক্রয়ে। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ইনভার্টার, ট্রান্সফরমার এবং স্কাডা সিস্টেম বাবদ ৭৩২ কোটি ২৫ লাখ টাকা খরচ ধরা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বৈচিত্র্য আসার পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে মোট শক্তির ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সহজতর হবে। বর্তমানে দেশের ২৮ হাজার ৮২৭ মেগাওয়াট অন-গ্রিড বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসে মাত্র ৭৯৭ মেগাওয়াট। নতুন এই ৪৪২ মেগাওয়াট যুক্ত হলে জাতীয় গ্রিড আরও শক্তিশালী ও পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠবে।