দেশের সার্বিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল ও বেগবান করতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সচিবালয়ে মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে যোগাযোগব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও নৌপরিবহন খাতের উন্নয়নে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে ১৬ হাজার ২০৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে মোট ১৩টি নতুন ও সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে নতুন গতি সঞ্চারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নতুন অনুমোদিত এই বিশাল বাজেটের অর্থায়নের দিকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল বা সরকারি অর্থায়ন থেকে জোগান দেওয়া হবে ১০ হাজার কোটি ৮০ লাখ টাকা। এছাড়া বৈদেশিক সহায়তা বা প্রকল্প ঋণ হিসেবে পাওয়া যাবে ৪ হাজার ৮১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় করা হবে ১ হাজার ৫২৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। মোট অনুমোদিত ১৩টি প্রকল্পের মধ্যে ১০টি সম্পূর্ণ নতুন প্রকল্প হিসেবে যাত্রা শুরু করবে। পাশাপাশি দুটি প্রকল্প সংশোধিত এবং একটি প্রকল্পের বাস্তবায়নের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এবারের একনেক সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য একাতেই সর্বোচ্চ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অনুমোদন লাভ করেছে। এই প্রকল্পগুলোর আওতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন সংযোজিত পাঁচটি অঞ্চলের ১৮টি ওয়ার্ডের বেহাল সড়ক অবকাঠামো ও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার আমূল উন্নয়ন করা হবে। এছাড়া রংপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা পুনর্বাসন, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ৮ নম্বর জোনের রাস্তাঘাট, নর্দমা এবং ফুটপাত নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হবে। নারীদের আত্মনির্ভরশীল ও দক্ষ করে তুলতে সমবায়ের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃজন শীর্ষক একটি বিশেষ প্রকল্পও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের দ্বিতীয় সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
যোগাযোগ ও পরিবহন খাতের আধুনিকায়নেও বেশ কিছু বড় প্রকল্পের সায় মিলেছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিআইডব্লিউটিসির জন্য ৩৫টি বাণিজ্যিক ও ৮টি সহায়ক জলযান সংগ্রহ এবং দুটি নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন পাস করা হয়েছে। রেলপথ খাতের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের একটি সুদূরপ্রসারী প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে পঞ্চগড় জেলার ভজনপুর এলাকার ১৫তম কিলোমিটারে দ্বিতীয় করতোয়া সেতু নির্মাণ এবং থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন। বৈদেশিক কূটনীতি ও কার্যক্রম জোরদার করতে ফ্রান্সের প্যারিসে ক্রয়কৃত চ্যান্সারি ভবন ব্যবহারোপযোগী করার লক্ষ্যে সংস্কার ও আধুনিকায়ন প্রকল্পটিরও অনুমোদন দিয়েছে একনেক।
বিদ্যুৎ খাতের সবুজ রূপান্তর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে রামপাল ৪৪২ মেগাওয়াট পিক সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প একনেকে সবুজ সংকেত পেয়েছে। অন্যদিকে, ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়সংবলিত অপর একটি প্রকল্প সম্পর্কে একনেক সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়, যা পরিকল্পনা মন্ত্রী ইতোমধ্যে অনুমোদন করেছেন। জয়পুরহাট জেলার নন্দাহার, হারাবতী নদী, নুনগোলা খাল এবং খাড়োয়া খাল পুনঃখননের মাধ্যমে কৃষিকাজ ও সেচ ব্যবস্থাপনার উন্নতি সাধন করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
পরিকল্পনা ও নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের এই সভায় সরকারের নীতিনির্ধারক ও মন্ত্রীরা উপস্থিত থেকে গুরুত্বপূর্ণ মতামত প্রদান করেন। সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, মহিলা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, ভূমি মন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু, শিল্প, বস্ত্র ও বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পানি সম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।