দ্বিতীয় স্ত্রীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় দায়েরকৃত আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলায় জামিন মেলেনি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের। বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উভয় পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে আজ বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর এই আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি হারুন অর রশিদ বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।
এদিনের শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান পারস্পরিক সমঝোতা ও আপসের শর্তে এমপি নজরুলের জামিন প্রার্থনা করেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মামলার বাদী ও মৃত মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ আদালতে একটি আপসনামা দাখিল করেন। সেখানে তিনি আদালতকে জানান যে, আসামি নজরুলের জামিনের বিষয়ে তার বা তাদের পরিবারের কোনো ধরনের আপত্তি নেই। এমনকি তিনি এও দাবি করেন যে, নিছক সন্দেহের বশে প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামসহ সংসদ সদস্য নজরুলকে এই মামলায় আসামি করা হয়েছিল। তবে বাদীপক্ষের আপসের ইচ্ছা সত্ত্বেও আদালত জামিন আবেদন মঞ্জুর করেননি।
মামলার বিবরণে জানা যায়, গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শের-ই-বাংলা নগর এলাকার নাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে ১৯ বছরের তরুণী মোসা. মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই মর্মান্তিক ঘটনার পরপরই নিহত মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শের-ই-বাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। আলোচিত এই মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ছাড়াও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম এবং শ্যালক ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তারের পর গত ২১ সেপ্টেম্বর এমপি নজরুলের চার দিন এবং তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদার একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছিল। রিমান্ডের মেয়াদ শেষে ২২ সেপ্টেম্বর মাকসুদাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে ২৩ সেপ্টেম্বর মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকেও কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে গত ২৪ সেপ্টেম্বর চার দিনের রিমান্ড শেষ করে নজরুল ইসলামকে পুনরায় চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এর কিছু দিন পর গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি আদালত থেকে প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম জামিন লাভ করেন।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের জুলাই মাসে মরিয়ম খাতুনের সাথে সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের বেশ কিছু ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এই অনৈতিক ঘটনার জেরে গত ২২ জুলাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে সাতক্ষীরা-৪ আসনের এই সংসদ সদস্যকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে। দলটির গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী নৈতিক স্খলনের প্রমাণ পাওয়ায় এই কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং নির্বাচন কমিশনকেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়।
ভাইরাল হওয়া ভিডিওর জেরে মারধর ও শ্বাসরোধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ এনে এর আগে গত ২১ জুলাই নিহত মরিয়মের মামা ও গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান পল্লবী থানায় একটি মামলা করেছিলেন। ওই মামলায় হাইকোর্ট থেকে গত ১০ আগস্ট আট সপ্তাহের আগাম জামিন পেয়েছিলেন নজরুল ইসলাম। কিন্তু পরবর্তীতে মরিয়মের আত্মহত্যার ঘটনায় দায়ের করা নতুন মামলায় সেই মামলার বাদী ওবায়দুর রহমানকেই অন্যতম আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেছেন যে, গত জুনের দিকে ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক মরিয়মের সাথে গাজী নজরুলের আক্দ সম্পন্ন হয়। সংসদ সদস্য হওয়ার সুবাদে তিনি প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ও দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে নিয়ে শের-ই-বাংলা নগরের সংসদ ভবনসংলগ্ন নাম ভবনের ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। বিয়ের পর থেকেই নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী বিভিন্ন অজুহাতে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে মরিয়ম তার পরিবারকে মোবাইল ফোনে জানিয়েছিলেন। ঘটনার দিন গত ২০ সেপ্টেম্বর বিকেলে নজরুল মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত তাদের বাসায় যেতে বলেন। বাসায় পৌঁছে তিনি দেখতে পান ঘরের ফ্যানের সাথে ওড়না পেঁচানো মরিয়মের মরদেহ ঝুলছে এবং বিছানায় একটি সুইসাইড নোট রয়েছে। আসামিদের চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং প্ররোচনার ফলেই তার মেয়ে বাধ্য হয়ে এই পথ বেছে নিয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।