আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর মামলার আসামি মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এই মামলার মূল তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম তার অবশিষ্ট সাক্ষ্য প্রদান করবেন। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এই সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর এই মামলার ১৫তম সাক্ষী হিসেবে তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে তার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করেছিলেন। ওই দিন তিনি আংশিক জবানবন্দি দেওয়ার পর পরবর্তী শুনানির জন্য ৪ অক্টোবর দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত দিনে সাক্ষ্যগ্রহণ না হওয়ায় আজকের দিনটি নতুন করে ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের দাবি, এ পর্যন্ত মোট ১৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আসামি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনীত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে তারা সম্পূর্ণরূপে সক্ষম হয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তার জবানবন্দি ও জেরা পর্ব শেষ হলেই মামলাটি যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করবে। তবে আইনি বিধান অনুযায়ী এর পর আসামিপক্ষ চাইলে নিজেদের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য উপস্থাপন করতে পারবে।
এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর এই মামলায় সাক্ষ্য প্রদান করেন কামরুল ইসলাম, যিনি তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে জব্দ করা গুরুত্বপূর্ণ আলামত ও নথিপত্র ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেন। একই দিনে মামলার ১৩তম সাক্ষী এবং র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) সাব্বির রহমানের জেরা পর্ব শেষ হয়, যিনি এই মামলার সর্বশেষ চাক্ষুষ সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এই মামলায় মোট তিনটি সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম অভিযোগটি হলো—২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর উপজেলার পুবাইল এলাকার একটি সড়কের পাশে আসামি জিয়াউলের সরাসরি উপস্থিতি ও নির্দেশনায় সজলসহ তিনজন ব্যক্তিকে নির্মমভাবে হত্যা করা। দ্বিতীয় অভিযোগের অপরাধের সময়কাল ধরা হয়েছে ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত।
এই দীর্ঘ সময়ে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের চরদুয়ানী খালঘেঁষা বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল ও মল্লিকসহ মোট ৫০ জনকে হত্যা করা হয়। তৃতীয় অভিযোগে একইভাবে আরও ৫০ জনকে হত্যার তথ্য তুলে ধরেছে প্রসিকিউশন। এই তৃতীয় অভিযোগেও ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বরগুনার বলেশ্বর নদী ও বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় তথাকথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে মাসুদসহ অর্ধশত মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, মানবতাবিরোধী অপরাধের এসব লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমলে নিয়ে ফরমাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এর পরপরই গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১ তাকে এই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আজকের এই সাক্ষ্যগ্রহণ বিচারিক কার্যক্রমকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।