রাজ্যের
নাম পরিবর্তন ও তার রাজনৈতিক
পরিচয় নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে ফের একবার তীব্র উত্তেজনা ও বিতর্কের ঝড়
উঠেছে। সমস্ত ভাষা ও মাধ্যমে রাজ্যের
একক ও সরকারি নাম
কেবল ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রাখার দাবিতে প্রবল সোচ্চার হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি। গত
মঙ্গলবার জলপাইগুড়িতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই সম্পর্কিত এক
গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি ও রাজ্যসভার সাংসদ
শমীক ভট্টাচার্য। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, আগামী বিধানসভার আসন্ন শীতকালীন অধিবেশনেই এই সংক্রান্ত একটি
বিশেষ বিল আনতে চলেছে দল, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই
রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে।
বিজেপির
রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সংবাদমাধ্যমের সামনে নাম পরিবর্তনের এই রাজনৈতিক ও
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান যে, ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বাঙালি
হিন্দুদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুনির্দিষ্ট ভূখণ্ড
গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই রাজ্যের সৃষ্টি
হয়েছিল। অবিভক্ত বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করে জন্ম নেওয়া এই রাজ্যের সঙ্গে
ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে দেশভাগের মর্মান্তিক ইতিহাস, বেদনা এবং অখণ্ড লড়াইয়ের স্মৃতি। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের
সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের
হাত ধরেই এই ভূখণ্ডের আত্মপ্রকাশ
ঘটেছিল। যারা অতীতে এই ঐতিহাসিক সত্যকে
অস্বীকার করে রাজ্যটিকে কেবল ‘বাংলা’, ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’ বা অন্য কোনো
নামে অভিহিত করার চেষ্টা করেছিলেন, সাধারণ মানুষ ও ইতিহাসপ্রেমী জনতা
সেই সিদ্ধান্তকে বহু আগেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে এই নামের সঙ্গে
জড়িয়ে থাকা আবেগ ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে
কোনোভাবেই খর্ব করা চলবে না।
এর
আগে জাতীয় স্তরেও এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন শমীক ভট্টাচার্য। সংসদীয় রাজনীতিতে তিনি রাজ্যসভার ফ্লোরে দাঁড়িয়েও সমস্ত ভাষাতে রাজ্যের নাম এক এবং অভিন্ন
রাখার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। অতীতে বিধানসভায় প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত আসনসংখ্যা না থাকলেও বর্তমান
রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলের অনুকূলে ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে বলে দাবি করেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি। তাঁর মতে, আগামী বিধানসভার শীতকালীন অধিবেশনে এই বিলটি উত্থাপন
করা হলে তা সর্বসম্মতিক্রমে পাস করানোর
জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়া হবে। আইনি বিধান অনুযায়ী, রাজ্য বিধানসভায় এই বিল পাস
হওয়ার পর তা কেন্দ্রীয়
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক হয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে প্রেরিত হবে।
উল্লেখ্য,
অতীতে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের জমানায় রাজ্যের নাম বদলে ‘বাংলা’ করার একটি প্রস্তাব রাজ্য মন্ত্রিসভায় পাস করিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নাম পরিবর্তনের এই উদ্যোগ নিলেও
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের
লাল ফিতার ফাঁসে সেই প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে ফাইলবন্দী অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অন্যদিকে, ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমানুসারে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল’ (West Bengal)-এর প্রথম অক্ষর
ডব্লিউ (W) হওয়ার কারণে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন
সম্মেলনে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিরা সবসময় তালিকার একেবারে শেষ পর্যায়ে বক্তব্য রাখার সুযোগ পান। প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক স্তরে
দীর্ঘদিনের এই অসুবিধার কথা
তুলে ধরে বিজেপি নেতৃত্ব জানাচ্ছে যে, বাংলা বা ইংরেজি—সব
মাধ্যমেই যদি নাম ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রাখা হয়, তবে এই ধরনের বিভ্রান্তি
ও প্রশাসনিক জটিলতাও অনেকাংশে দূর করা সম্ভব হবে।
সাম্প্রতিক
সময়ে কেরলসহ দেশের অন্যান্য রাজ্যের নাম পরিবর্তন এবং ঐতিহ্য রক্ষার্থে নানা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঠিক এই আবহেই পশ্চিমবঙ্গের
নাম সব ভাষাতেই এক
রাখার এই ঘোষণা রাজ্য
রাজনীতিতে এক নতুন মোড়
এনে দিয়েছে। বিরোধী দলের এই তৎপরতার ফলে
শাসক শিবির কীভাবে এর জবাব দেয়
এবং আসন্ন শীতকালীন বিধানসভা অধিবেশনে এই বিল পেশ
ও পাসের প্রক্রিয়া কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল।