বিশ্বকাপ
ফাইনালে কী ঘটেছিল? নীরবতা
ভাঙলেন লিওনেল মেসি
আন্তর্জাতিক
ফুটবলকে চিরতরে বিদায় জানানোর স্মরণীয় রাতে এক আবেগঘন ও
ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্ম দিলেন ফুটবলের রাজপুত্র লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। বুয়েনস আইরেসের ঐতিহাসিক এস্তাদিও মাস মনুমেন্তালে অনুষ্ঠিত তার বর্ণাঢ্য বিদায়ী ম্যাচে বেনিনকে ৩-০ গোলের
বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে এটিই ছিল এলএমটেনের জীবনের শেষ ম্যাচ। মাঠে নিজের চিরচেনা জাদুকরি ছন্দে খেলে তিনি একটি পেনাল্টি থেকে গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করান আরও দুটি চমৎকার গোল। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর যখন তিনি
মাইক্রোফোন হাতে নেন, তখন পুরো গ্যালারি জুড়ে এক অদ্ভুত নীরবতা
নেমে আসে, যা পরবর্তীতে রূপ
নেয় কান্নার রোল আর করতালির এক
মিশ্রিত আবেগে।
বিদায়ী
ভাষণে মেসি তার দীর্ঘ দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের নানা প্রাপ্তি, সংগ্রাম ও স্মৃতির কথা
যেমন অকপটে জানিয়েছেন, তেমনই খোলামেলা আলোচনা করেছেন সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বফাইনাল বা টুর্নামেন্টের বিভিন্ন
বিতর্ক ও গুঞ্জন নিয়ে।
বিশেষ করে বিশ্বকাপ ফাইনাল বা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোর
পর দলের অন্দরে বড় কোনো সমস্যা
বা মতবিরোধ হয়েছিল কি না, তা
নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা মুখরোচক ও ভিত্তিহীন গল্প
ছড়িয়ে পড়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কিছু ভিডিওতে তাকে ‘সবাই শান্ত হও’ জাতীয় অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে দেখা যাওয়ার পর থেকেই ড্রেসিংরুমের
পরিবেশ নিয়ে তীব্র জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছিল। এমনকি সাধারণ সমর্থকদের মনেও এ নিয়ে নানা
প্রশ্ন দানা বেঁধেছিল।
ভক্ত
ও সমালোচকদের সকল কৌতূহল এবং গুজবের জবাব দিয়ে মেসি তার বিদায়ী ভাষণে সেদিনের প্রকৃত পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন। তিনি জানিয়েছেন, দলের ভেতর বা ড্রেসিংরুমে কোনো
অস্বাভাবিক বা অপ্রীতিকর ঘটনা
ঘটেনি। বিশ্বমঞ্চের লড়াইগুলো কতটা রোমাঞ্চকর এবং একই সঙ্গে কতটা ক্লান্তিকর হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করতে
গিয়ে তিনি জানান যে সর্বশেষ বিশ্বকাপের
পুরো যাত্রায় তাদের ওপর দিয়ে ভীষণ বড় মানসিক ও
শারীরিক ধকল গেছে। দেশের কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন ফের একবার বাস্তবে রূপ দেওয়ার সেই তীব্র আবেগ ও চাপের মুখে
তারা নিজেদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার
শেষ সীমানায় পৌঁছে গিয়েছিলেন।
বিশেষ
করে নকআউট বা কঠিন ম্যাচগুলোর
চাপের কথা স্মরণ করে মেসি বলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষের ম্যাচটি তাদের জন্য ছিল অত্যন্ত তীব্র ও প্রচণ্ড চাপের।
বিশ্বকাপের পর সেই ম্যাচের
ধকল এবং শারীরিক ক্লান্তির কারণে নানা রকম তত্ত্ব ও বানোয়াট গল্প
ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো নেতিবাচক কিছু ঘটেনি। তিনি ও তার সমস্ত
সতীর্থরা দেশের জার্সির জন্য নিজেদের শেষ বিন্দু পর্যন্ত শক্তি দিয়ে লড়াই করেছেন। মানসিক ও শারীরিকভাবে তারা
যখন চরম ক্লান্তির মুখোমুখি হয়েছিলেন, তখনও তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশের মান রক্ষা করা এবং সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটানো।
মেসির
এই খোলামেলা স্বীকারোক্তি ও আবেগপ্রবণ বক্তব্য
বিশ্বজুড়ে থাকা তার কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করেছে। মাঠের জাদুকর যেভাবে জয়, পরাজয়, বিতর্ক এবং বিদায়ের মুহূর্তগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন, তা ফুটবল ইতিহাসের
পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বর্ণাঢ্য এই অধ্যায়ের সমাপ্তি
ঘটলেও আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির অবদান ও তার এই
বিদায়ী ভাষণ ফুটবলপ্রেমীদের মনে যুগ যুগ ধরে অম্লান হয়ে থাকবে।