জাতিগঠনের প্রধান কারিগর শিক্ষক সমাজের বহুমুখী বঞ্চনা ও দীর্ঘদিনের না পাওয়ার বেদনা দূর করে তাদের পেশাগত মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছে বর্তমান প্রশাসন। রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের উদ্যোগে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য ও প্রাণবন্ত সমাবেশে দেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারকরা শিক্ষক সমাজের অধিকার আদায়ের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় আশ্বস্ত করেছেন যে, দেশের শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের যৌক্তিক ও নায্য দাবিগুলো বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে ধাপে ধাপে এবং পর্যায়ক্রমে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে।
বিগত ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী শাসনামলে দেশের পুরো শিক্ষা খাতের করুণ চিত্র তুলে ধরে অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী অত্যন্ত কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি জোরালো অভিযোগ করেন যে, শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী আমলে সুপরিকল্পিতভাবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে। সেই গভীর ধ্বংসলীলা থেকে শিক্ষা খাতকে পুনরুজ্জীবিত করে একটি আধুনিক, নৈতিকতাসম্পন্ন ও মানসম্মত কাঠামোগত ভিত্তি ফিরিয়ে আনতে হবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। বিগত সরকারের আমলের ত্রুটিপূর্ণ ও রাজনৈতিক মতাদর্শনির্ভর শিক্ষানীতির কঠোর সমালোচনা করে তিনি উল্লেখ করেন যে, ফ্যাসিবাদী আমলে পরীক্ষার খাতায় একটি অক্ষরও না লিখে কেবল রাজনৈতিক আনুগত্যের জোরে অযোগ্যদের পাশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা এ দেশের মেধাবী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।
শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত নিরাপত্তা প্রসঙ্গে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে রিজভী বলেন যে, জাতির মেরুদণ্ড গঠনকারী শিক্ষকরা নিজেদের মৌলিক ও নায্য অধিকার আদায়ের জন্য রাজপথে আন্দোলন করতে বাধ্য হচ্ছেন—এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও জাতির জন্য লজ্জাজনক। একটি জাতি তখনই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী হতে পারে, যখন দেশের শিক্ষকরা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকেন। এ সময় তিনি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বিরাজমান আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা ও খামখেয়ালিপনার তীব্র সমালোচনা করে জানান যে, লালফিতার এই দৌরাত্ম্যের কারণে শিক্ষকদের নিয়মিত বদলি এবং মর্যাদাপূর্ণ পদোন্নতি প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা অবিলম্বে দূর করা অত্যন্ত জরুরি।
একই সমাবেশে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রাখতে গিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন শিক্ষক সমাজের ঐতিহাসিক অবদান ও বঞ্চনার শিকার হওয়ার দুঃস্মৃতি স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ফ্যাসিস্টদের দীর্ঘ দমনপীড়নের সময়ে শিক্ষকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি, অপমান ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তবে শিক্ষক সমাজের সামগ্রিক অধিকার রক্ষায় অতীতেও বিএনপি সবসময় অগ্রণী ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে বলে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে দাবি করেন। শিক্ষকদের অধিকার রক্ষা ও তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি ঘোষণা দেন যে, খুব দ্রুতই শিক্ষকদের যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবিগুলো বাস্তবায়িত হবে। এছাড়া শিক্ষকদের প্রাণের দাবি জাতীয়করণের বিষয়টি জাতীয় সংসদে আলোচনার মাধ্যমে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে চূড়ান্ত করা হবে বলেও তিনি উপস্থিত শিক্ষক নেতাদের আশ্বস্ত করেন।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই শিক্ষক সমাবেশে সারা দেশ থেকে আগত হাজার হাজার নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক-কর্মচারী নেতা ও প্রতিনিধিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে তাদের সুনির্দিষ্ট দাবিদাওয়া তুলে ধরেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন, বেতন বৈষম্য দূরীকরণ এবং একটি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার দাবি জানান বক্তারা। শিক্ষকদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করার এই অঙ্গিকার ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী জাতি গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সমাবেশ শেষে দেশজুড়ে শিক্ষক সমাজের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক হিসেবে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি নগরীর প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে।