ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬,  ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শ্রীপুরে বিকাশের ক্যাশ ম্যানেজারকে গুলি করে আড়াই কোটি টাকা ছিনতাই জলপরী কি সত্যিই আছে? হাজার বছরের পুরোনো মৎস্যকন্যার মিথের আসল ইতিহাস দীর্ঘক্ষণ সাইক্লিং কি পুরুষদের শুক্রাণুর মান কমিয়ে দেয়? জানুন বিশেষজ্ঞদের মতামত রাজনীতি হতে হবে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য: এলজিআরডি মন্ত্রী কে এই নাভি পিল্লে: বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেক নোবেল জয় জুনিয়র এনটিআর ও পুলিশ কমিশনারের এআই ছবি নিয়ে তীব্র বিতর্ক প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব নিশ্চিত করতে হবে: অর্থমন্ত্রী! জুমার পর বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিক্ষোভ ইরানের ‘শ্যাডো ফ্লিটে’র ১৭ জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বিশ্ববাজারে ডলারের দরপতন ও তেলের দামে বাড়ল স্বর্ণের দাম

কে এই নাভি পিল্লে: বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেক নোবেল জয়


  • আপলোড সময় : শুক্রবার ০৯ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৩:৪৯ পিএম

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যপূর্ণ শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বিচারাঙ্গনের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানো—আজীবন মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেছেন প্রখ্যাত আইনজ্ঞ ও বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লে।


শুক্রবার নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি ৮৫ বছর বয়সী এই বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের নাম বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে। কমিটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকার জন্যই তাঁকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত শক্তিশালী রাষ্ট্র ও ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে আপসহীন আইনি লড়াইয়ে আজীবন সোচ্চার ছিলেন নাভি পিল্লে।


১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বর্ণবৈষম্যভিত্তিক কঠিন ও নিপীড়নমূলক শাসনামলে বেড়ে ওঠার কারণে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে নানা সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়। পরিবারের আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি নাটাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৬৭ সালে নাটাল প্রদেশে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তৎকালীন সময়ে তিনিই ছিলেন ওই প্রদেশের প্রথম নারী আইনজীবী।


বর্ণবৈষম্যের শিকার বঞ্চিত মানুষের পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনা এবং রবেন দ্বীপের কারাগারে বন্দি রাজনৈতিক কর্মীদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ঐতিহাসিক ও সাহসিকতাপূর্ণ। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনের চূড়ান্ত অবসানের পর ১৯৯৫ সালে তিনি নাটাল হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পান, যা দেশটির বিচার বিভাগের ইতিহাসে প্রথম কোনো কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে এই পদে আসীন হওয়ার অনন্য ঘটনা ছিল।


দক্ষিণ আফ্রিকার গণ্ডি পেরিয়ে পিল্লের কর্মজীবন দ্রুতই আন্তর্জাতিক বিচারাঙ্গনে বিস্তৃত হয়। ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ তাঁকে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে নির্বাচন করে। সেখানে তিনি দীর্ঘ আট বছর অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, যার মধ্যে ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত চার বছর তিনি ট্রাইব্যুনালের সভাপতির দায়িত্বেও নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৯৪ সালের মর্মান্তিক রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার পরিচালনা এবং ঐতিহাসিক আকায়েসু মামলায় ধর্ষণকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গণহত্যার অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আইনি ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁর সাহসী ভূমিকা ছিল যুগান্তকারী। এই ঐতিহাসিক রায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন এবং সশস্ত্র সংঘাতে নারী সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী আইনি নজির স্থাপন করেছে।


পরবর্তীতে ২০০৩ সালে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। এরপর ২০০৮ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান নেন। আন্তর্জাতিক নারী অধিকার সংগঠন ‘ইকুয়ালিটি নাউ’ প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তিনি সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তা ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনশাস্ত্রে ডক্টরেট অর্জনকারী প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকান নারী হিসেবেও তিনি অনন্য গৌরব অর্জন করেছেন।


জাতিসংঘের শীর্ষ দায়িত্ব থেকে অবসরের পরও মানবাধিকার রক্ষায় তাঁর কর্মতপরতা থামেনি। আন্তর্জাতিক মৃত্যুদণ্ডবিরোধী কমিশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলায় অ্যাড হক বিচারক হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। মানবাধিকার রক্ষায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৫ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়ার মর্যাদাপূর্ণ সিডনি শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। দীর্ঘ ১২৫ বছরের ইতিহাস বহনকারী নোবেল শান্তি পুরস্কারের চলতি আসরে ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা অর্থমূল্যের এই সম্মাননা নাভি পিল্লে এবং বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার দীর্ঘ সংগ্রামকেই নতুন উচ্চতা প্রদান করল।

সূত্র: দ্য স্টেটসম্যান


এ সম্পর্কিত আরো খবর