বিশ্বজুড়ে জ্বালানি মূল্যের তীব্র বৃদ্ধি, ঋণের সুদ ও সরকারি ধারের ভার, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দ্রুত সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি হ্রাস এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ‘আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বার্ষিক সভা ২০২৬’-এর সাইড ইভেন্টে ‘অ্যাডাপ্টিং টু আ চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড: হাউ ইজ দ্য আইএমএফ হেল্পিং কান্ট্রিজ নেভিগেট নিউ প্রেসারস?’ শীর্ষক এক বিশেষ প্যানেল আলোচনায় বিশ্বখ্যাত নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদরা এসব গুরুত্বপূর্ণ তাগিদ দেন।
আইএমএফের স্ট্র্যাটেজি, পলিসি অ্যান্ড রিভিউ বিভাগের পরিচালক ক্রিশ্চিয়ান মুমসেন আলোচনায় মূল বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে একের পর এক ধাক্কা আসা সত্ত্বেও যে স্থিতিস্থাপকতা দেখা যাচ্ছে, তাকে স্থায়ী মনে করার কোনো সুযোগ নেই। বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন উচ্চমাত্রার অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। বৈশ্বিক বন্ডের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
উন্নত দেশের এই উচ্চ সুদহারের সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিম্ন আয়ের ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর, যার ফলে এসব দেশের জন্য ঋণ পরিশোধের খরচ জোগানো ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা চরম কঠিন হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ও কম রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতের দেশের জন্য এই বার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মত প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা।
মুমসেনের মতে, বিশ্ব অর্থনীতি ও সামষ্টিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য কেবল তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; বরং দেশগুলোকে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি বিশ্বাসযোগ্য আর্থিক কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নমনীয় ও কার্যকর মুদ্রানীতি প্রণয়ন, অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় হ্রাস এবং লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিতের পরামর্শ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের রূপান্তর, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাটাতে নজরদারির তাগিদ দিয়েছে আইএমএফ। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রকে কেবল ঋণের ওপর ভরসা না করে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে একটি নির্ভরযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানান অর্থনীতিবিদরা।
আলোচনায় আরও বলা হয়, সদস্যদেশগুলোর পরিবর্তিত চাহিদা ও পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে আইএমএফ তাদের সার্ভেইল্যান্স ও পর্যালোচনা পদ্ধতিগুলোতে সংস্কার আনছে। এতে কমপ্রিহেনসিভ সার্ভেইল্যান্স রিভিউ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের যৌথ লো-ইনকাম কান্ট্রি ডেট সাসটেইনেবিলিটি ফ্রেমওয়ার্ক রিভিউর মাধ্যমে দেশগুলোর ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা ও ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করা সহজ হবে।
আন্তর্জাতিক স্তরে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার পাশাপাশি কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার মাধ্যমেই বাংলাদেশ সহ ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারবে বলে মত প্রকাশ করেন আইএমএফ কর্মকর্তারা।