রেজাউল করিম ঝন্টু , সিরাজগঞ্জ
ঋতু বৈচিত্র্যের আবহে গ্রামীণ জনপদে শুরু হয়েছে শীতের আগমনী বার্তা। দিনে তীব্র খরতাপ থাকলেও রাতের শেষ ভাগে অনুভূত হচ্ছে মৃদু শীত। ভোরের আলো ফুটতেই লতা-পাতা, ঘাস আর সবুজ আমন ধানের ডগায় দেখা মিলছে শুভ্র শিশির বিন্দু ও ঘন কুয়াশা। আর এই রূপালী বার্তাকে কেন্দ্র করে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় গাছিদের মাঝে শুরু হয়েছে খেজুর রস সংগ্রহের ধুম। রস সংগ্রহের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে উপজেলার গাছিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন খেজুর গাছের ডাল ও শাখা-প্রশাখা কেটে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজে। শীতকালীন এই ঐতিহ্যবাহী রস ও গুড় উৎপাদনের প্রাথমিক ধাপ শুরু হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে নতুন এক আমেজ সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয় গাছিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, খেজুর গাছ থেকে মানসম্মত রস সংগ্রহ করতে হলে প্রথমে গাছের মাথা বা উপরিভাগ খুব ভালো করে পরিষ্কার করতে হয়। এরপর গাছের ভেতরের সাদা অংশ কেটে কয়েক দিন কড়া রোদে শুকিয়ে নিতে হয়, যাকে আঞ্চলিক ভাষায় 'কাম দেওয়া' বলা হয়। পরবর্তীতে সেই সাদা অংশ আবার হালকা কেটে বিশেষ নলি বা বাঁশের কঞ্চি লাগানো হয় এবং রস জমার জন্য ছোট-বড় মাটির পাত্র বেঁধে দেওয়া হয়। গাছিরা জানান, সাধারণত কার্তিক মাসেই এই গাছ প্রস্তুত করার উপযুক্ত সময়। জমির আইল, রাস্তার পাশ এবং পুকুরপাড়ে অবহেলায় বেড়ে ওঠা খেজুর গাছগুলোকেই এখন ছেঁটে প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তাড়াশ উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের রানীদিঘী গ্রামের প্রবীণ গাছি ইয়াছিন রস সংগ্রহের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানান, একটি গাছকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত করতে প্রায় একদিন সময় লাগে। রস সংগ্রহের জন্য সাধারণত ৬ থেকে ১০ লিটার ধারণক্ষমতার মাটির হাঁড়ি ব্যবহার করা হয়। রস দীর্ঘক্ষণ ভালো রাখতে এবং টক হওয়া থেকে বাঁচাতে হাঁড়ির ভেতরে চুন বা চুন-পানির প্রলেপ দেওয়া হয়।
তবে যে গাছের কাঁচা রস সরাসরি খাওয়ার জন্য বিক্রি করা হয়, সেই হাঁড়িতে কোনো চুন ব্যবহার করা হয় না। তিনি আরও বলেন, "একটি গাছ থেকে টানা ২ থেকে ৩ মাস রস পাওয়া যায়। গাছ ভেদে প্রতিদিন ১ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত রস মিলতে পারে। তবে রস সংগ্রহের একটি সনাতন নিয়ম রয়েছে; প্রথম তিন দিন গাছ থেকে রস সংগ্রহের পর পরবর্তী তিন দিন গাছকে বিশ্রাম দিতে হয়, যাকে আমরা 'পালি দেওয়া' বলি। বিকেল ৩টা থেকে গাছে গাছে হাঁড়ি বাঁধা শুরু হয় এবং পরদিন কুয়াশা ঘেরা ভোর ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে রস নামানো হয়।"
গাছিরা আরও জানান, রস সংগ্রহের পর শুরু হয় পরবর্তী ধাপ অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী লালি বা দানা গুড় তৈরির প্রক্রিয়া। সংগৃহীত রস প্রথমে ছেঁকে বড় পাত্রে বা 'খোলায়' ঢেলে কড়া আগুনে জ্বাল দেওয়া হয়। আগুনের তাপে রস ঘন হয়ে ধীরে ধীরে লাল রঙ ধারণ করে এবং চারদিকে এক সুস্বাদু সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে। ১ কেজি খাঁটি গুড় তৈরি করতে প্রায় ১২ থেকে ১৫ কেজি কাঁচা রসের প্রয়োজন হয়।
বর্তমানে নিজেদের খেজুর গাছ না থাকায় অন্য মালিকদের কাছ থেকে গাছ ঠিকা বা লিজ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। এর জন্য প্রতি গাছের মালিককে মৌসুম শেষে ৭ কেজি লালি গুড় অথবা নগদ ১ হাজার টাকা দিতে হয়। তবে বয়সের ভার এবং দিন দিন খেজুর গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে হতাশা ব্যক্ত করেছেন গাছি মোতালেব, শরিফুল, আজমল ও জাহিদুল।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্তা জানান, শীত মৌসুমে খেজুরের রস ও গুড় সবার কাছেই বেশ সমাদৃত এবং এটি গ্রামীণ কৃষকদের বাড়তি আয়ের একটি অন্যতম বড় উৎস। যেহেতু খেজুর গাছের জন্য বাড়তি কোনো রাসায়নিক সার বা বিশেষ পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না, তাই কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের বাড়ির আশপাশ, পরিত্যক্ত জমি, জমির আইল, পুকুরপাড় এবং সড়কের ধারে বেশি করে খেজুর গাছ লাগানোর জন্য উৎসাহিত ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পরিত্যক্ত জমিতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে খেজুরের বাগান গড়ে তোলা সম্ভব হলে স্থানীয় কৃষকেরা অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক লাভবান হবেন।