ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬,  ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নকশা বহির্ভূত ভবন রক্ষা ও নজিরবিহীন রাজউক দুর্নীতি প্রটোকল ভেঙে জনতার সাগরে হেঁটে মানিক মিয়ায় প্রধানমন্ত্রী ষড়যন্ত্র করে গণতন্ত্রকামী মানুষকে দমানো যাবে না: প্রধানমন্ত্রী রিমান্ড শেষ: তাহসিফ হত্যা মামলায় কারাগারে দীপ নবাবগঞ্জে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রকে পুকুরপাড়ে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন ডেঙ্গুতে আরও ৩ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৬৭৪ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে বগুড়া খাদ্য অফিসে বহাল তবিয়তে শহিদুল কুমিল্লায় বছরে ১২০টি হত্যাকাণ্ড, অপরাধের ঊর্ধ্বগতিতে চরম উদ্বেগ ৭ নভেম্বরের আদর্শ ধারণ করেই ২০২৪-এর বিপ্লব সফল হয়েছে: রিজভী গ্রাম পুলিশদের বেতন বৃদ্ধি ও নতুন সুযোগ-সুবিধার ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

রাসায়নিকের জাল থেকে মুক্তির উপায় কী শুধুই জরিমানা, নাকি সঠিক শিক্ষা?


  • আপলোড সময় : শনিবার ০৭ নভেম্বর, ২০২৬ সময় : ৫:১১ পিএম


দেশ-দশের কোন বিষয় নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। তারপরও কিছু কিছু বিষয় দেখলে কথা না বলে পারি না।


পেঁপে পাকানোর আড়তে মোবাইল কোর্ট গিয়েছে। ভিডিওর থামলাইন দেখে ভয় পেয়ে গেলাম। বিষাক্ত রাসায়নিকের কথা বললে এমনিতেই ভয় হয়। তার উপর আমি পাকা পেঁপের নিয়মিত ভোক্তা।


যাইহোক অফিসার সব দেখে শুনে বললেন—পেপার দিয়ে পেঁপে মোড়ালেন কেন? পেপারে কার্বন থাকে। সাদা কাগজ ব্যবহার করেন না কেন?


কেন?


এই কেন- প্রশ্নবোধক কথাতেই আমার মোবাইল কোর্টের ভিডিও দেখার প্রতি অরুচি জন্ম নিল।


যাইহোক আসল কথায় আসি। এটা ওপেন সিক্রেট যে, আমাদের দেশে আম থেকে পাকা পেঁপে— সব কিছুতেই কোনো না কোনো রাসায়নিক স্প্রে করা হয়। এমনকি শাকসবজি, আলু, পেঁয়াজ, রসুন— সব কিছুতেই। আমরা জেনে-বুঝে নিরুপায় হয়ে সে সব খেতে বাধ্য হই। মাংস থেকে যেভাবে হরমোন আর অ্যান্টিবায়োটিক পেটে ঢুকছে, তাতে অনেকগুলো অ্যান্টিবায়োটিক হয়তো রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতা পেয়ে গেছে।


তারপরও আমরা বাধ্য হয়ে খাচ্ছি। প্রতিদিনই খাচ্ছি।


আমার প্রশ্ন— এসব থেকে রেহাই পেতে আমরা কি আগাম সতর্কতা গ্রহণ করছি?


আগে থেকে কৃষককে বলা বা বাজারে যে বা যারা এসব রাসায়নিক দ্রব্যকে সহজলভ্য করে তুলছে, তাদের বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থা নিয়েছি?


মাঝে মাঝে ভিডিওতে বাজারে মোবাইল কোর্ট হতে দেখি, দাম থেকে পণ্যের মান নিয়ে। ভালো কাজ, বাহবা দিই সবাই।


আচ্ছা, কখনো খেয়াল করে দেখেছেন একটা মুদি দোকানে কত পরিমাণ চিপস, বিস্কিট, জুস, কোল্ড ড্রিংকস থাকে? সবগুলোই আনহেলদি। নামিদামি সব কোম্পানিকেই মেনশন করতে চাই।


সেগুলো খেলে কী হয় জানেন হয়তো—

বাচ্চাদের কিডনিতে চাপ পড়ে, লস অব অ্যাপেটাইট, গ্যাস্ট্রোলাইটিসসহ আরও অনেক অনেক শারীরিক অসুবিধা।


আমাদের দেশে বড়দের ফ্যাটি লিভার এখন কমন অসুখ।


কয়েক বছর আগে সিঙ্গাপুরের একজন ডাক্তার আমাকে বলেছিলেন—

“ইউ আর সো লাকি। তোমার ফ্যাটি লিভার নেই।”


তারা ফ্যাটি লিভারকে লিভার সিরোসিসের সূচনা মনে করেন।


এবার আসি আমাদের দেশের অবস্থায়। আপনি যে কোনো ডাক্তারকে বলবেন— ফ্যাটি লিভার গ্রেড ওয়ান।


বলবে, ওটা সবারই থাকে। নইলে ওষুধ দিবে।


লাইফস্টাইল পরিবর্তন— হাঁটা, কার্ব কমানো যে অন্যতম চিকিৎসা, বেশিরভাগ ডাক্তারই তা বলার আগ্রহ দেখান না।


আমার কথা এই যে, সবকিছুকে লাইটলি নেওয়ার প্রবণতা— এটা যে একজন মানুষকে মৃত্যুর দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে পারে, আমাদের সেই সচেতন বুদ্ধিটুকুই নেই।


গতকাল থেকে দেখছি আমাদের দেশের সাংবাদিকরা পড়ে আছে পরীমনির শরীরের কে হাত দিল, তা নিয়ে। আমার বিশ্বাস হয় না জনসমক্ষে কোনো সাংবাদিকের এতটা সাহস হবে যে পরীমনির শরীরে ইচ্ছাকৃত হাত দিয়ে বসবে। যদি ভিউ ব্যবসার কারণে হয়ে থাকে, সে অন্য কথা।


আমাদের সমাজের মানুষদের সচেতন বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। তারা ভিউ বাণিজ্য বুঝেছে। জাকির ভাইয়ের কেক ভাইরাল, ফুটপাতে ভাতের হোটেল ভাইরাল— এসব নিউজ করতে ব্যস্ত।


গতকাল পাকা পেঁপের নিউজ দেখে মনে হলো বলা দরকার।


আমি দেশের বাইরের সুপারমার্কেটে দেখেছি। নিখুঁত ফল, সবজি, পাকা কলা, পেঁপে। মুরগি মানেই ব্রয়লার।


আপনাদের কী মনে হয়, তারা হরমোন বা রাসায়নিক ব্যবহার করে না?


আমার স্পষ্ট ধারণা, তারাও রাসায়নিক ব্যবহার করে। তবে হয়তো সঠিক পরিমাণে।


তাই আমি মনে করি, সরকারিভাবে ফল বিক্রেতা থেকে সবজি বিক্রেতা, উৎপাদক কৃষক থেকে শুরু করে ভোক্তা— সবার চোখে আঙুল দিয়ে শিখিয়ে দেওয়া উচিত, কোনটা কতটুকু ব্যবহার করা উচিত, কোনটা ব্যবহার করা উচিত নয়।


দরকার হয় হাতে কলমে শিখিয়ে দিন—

কীভাবে পেঁপে পাকাতে হয়।

কীভাবে ফল সংরক্ষণ করতে হয়।

কতটা হরমোন ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ।


আমি আমার বাচ্চাদের শিখিয়েছি, প্রপার স্বাদ নেই মানে ফল পোক্ত হয়নি। আমার দুই ছেলেমেয়ে যখন পেঁপে কাটে, ওরা জানে— বীজ কালো রঙের এবং পুষ্ট, অর্থাৎ পেঁপে পরিপক্ক।


ব্যাপারটা বুঝুন— বাণিজ্যিক দিক থেকে চিন্তা করে পেঁপে পাকাতে হলে তো আর গাছপাকা পেঁপে বা গাছপাকা আম-কাঁঠাল এনে বাজারে বিক্রি করা সম্ভব নয়।


তাই জরিমানার পাশাপাশি সঠিক পদ্ধতিগুলো ঠিকমতো শিখিয়ে দিন। মাঠ পর্যায়ে প্যাকেজিং শেখান। রাসায়নিক বাদে বেশি দিন সংরক্ষণের পদ্ধতি শেখান।


আমি সব সময় বিশ্বাস করি, কৃষক ও বিক্রেতাদের যদি সঠিক পদ্ধতি শিখিয়ে দেওয়া যায়, তারা অবশ্যই অনুসরণ করবে।


কে চায় অযথা কেমিক্যালের পেছনে টাকা খরচ করতে? আজকাল এমনিতেই চাষাবাদে যত পরিমাণ খরচ হয়, কিছু খরচ কমাতে পারলে কৃষক ও বিক্রেতাই লাভবান হবে। তাই সঠিক নিয়ম শিখিয়ে দেওয়া আবশ্যক। তাছাড়া যদি একদিন হুট করে গিয়ে বলেন—


“এটা কেন করলে, ওটা কেন করলে?”


তাহলে আমার মনে হয়, তারা শুধু লুকোতেই শিখবে।


শুরুতেই বলেছিলাম— “কেন” শব্দটা শুনে দেখার প্রতি অরুচি জন্ম নিল। কারণ “কেন?”, “কীভাবে?” প্রশ্নগুলো আমাদের সবার মনেই আছে।


আমাদের উত্তরটা জানা নেই। পরিত্রাণের সঠিক পদ্ধতি জানা নেই। তাই ছোটবেলায় যেমন শিখেছি, সবুজ শাক হলুদ ফল খেলে রাতকানা রোগ হয় না; ঠিক তেমনি করে রাসায়নিক ব্যবহার করা ফল-সবজি চেনার উপায় এবং রাসায়নিক ব্যবহার না করে ফল-সবজি সংরক্ষণের উপায় শিখিয়ে দিন।

আমি আমার কথা বললাম।

আপনি আপনার মতো করে ভেবে দেখুন।


-লেখক কানিজ ফাতেমা - কবি ও কথাসাহিত্যিক।


এ সম্পর্কিত আরো খবর