মামুনার রশীদ,বগুড়া
"কোকিল কোথায়,কাক কোথায়
কাক কোকিলের কর্ম কথায়"
আজ আর মানুষ, সমাজ,রাজনীতি ও অসাম্যের কথা নয়, আজ বলবো কাকের কথা,কাক কোকিলের বিস্তর ব্যবধানের কথা।কোকিল ডাকে কুহু কুহু যা মানুষকে বিমোহিত করে,প্রাণ ভরায় কিন্তু কাকের কা কা ডাকে মিষ্টি নেই,আকর্ষণ নেই তবে আছে প্রকৃতির উপকার, মানুষের কল্যাণ।কোকিলের ডাক সুন্দর এবং তার জন্য কোকিলকে নিয়ে কবি,সাহিত্যিক,প্রেমিক-প্রেমিকা সবাই কিছু না কিছু লিখেছে কিন্তু কোকিল কখনো মানুষের উপকারে কিছু করেছে এমনটি কোথাও লেখা দেখি নি।
অপর দিকে কাক কালো কুঁচকুঁচে,শক্ত পালক, বেঢপা কণ্ঠস্বর -সব ঠিক আছে তবে কাকের কিন্তু অজস্র গল্প আছে।কাক একটা পরিবেশবান্ধব পাখি এবং মানুষের উপকারে নিবেদিত প্রাণ।আজকের মুসলিম সমাজে যে কবরের রেওয়াজ মেনে চলে,কেউ মারা গেলে তাকে কবরস্থ করতে হবে - এই শিক্ষা কিন্তু মানুষ প্রথম পেয়েছিল কাকের কাছ থেকে। আদি মানব হযরত আদম (আঃ) এর দুই সন্তানের দ্বন্দ্বে যখন হাবিল মারা যায় তখন তার মৃত দেহ কী করবে এ নিয়ে বেশ দ্বিধায় পড়ে যায় কাবিল।তখন সে দূরে দেখে যে একটা কাক তার মৃত সঙ্গীর দেহকে মাটিতে পুঁতে রেখে দিচ্ছে আর এভাবেই কাবিলের মাথায় বুদ্ধি এলো।সুতরাং, এ কারণে হলেও মানুষের উচিত কাকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা।
কাকের এমন অনেক গল্প আছে।কাক একটি বুদ্ধিমান কিন্তু সরল প্রাণি।এরা ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে।একটি কাক ৬-১০ বছর পর্যন্ত জীবনকাল লাভ করে।তবু আমরা মনে হয় কাক কাতর নই বরং কোকিলের ডাকে ভুলে যাই কাকের উপকারি কারিশমা।সঙ্গী হিসাবে কাকের তুলনা হয় না।একটা কাক কখনো সঙ্গীহীন হলে আর কখনো ই নতুন সঙ্গীর খোঁজ করে না।কাক খুব সঙ্গী ভক্ত হয়।কোনো কারণে কাক তার সঙ্গী হারালে আর নব সঙ্গীর খোঁজ করে না।অবশ্য কাকদের যদি ফোন,ফেসবুক, মেসেঞ্জার,হোয়াটসঅ্যাপ নামক ব্যাপার থাকতো তাহলে হয়তো কখনো ই সঙ্গীহীন হতো না, কাউকে না কাউকে খুঁজেই নিত।ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে তারা সামাজিক জীব নয় এবং এ সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় তাদের থাকতে হয় না।
মানুষ
বুদ্ধিমান প্রাণী।বুদ্ধি, জ্ঞান, বিবেক, সৃজনশীলতা সব ই আছে।পাখিদেরও এসব আছে।কাককে
কেন বুদ্ধিমান পাখি বলা হয় তা আমরা ছোট বেলায় একটা গল্পে পড়েছি।একদিন এক কাক খুব তৃষ্ণাকাতর
হলো।সে এদিক সেদিক উড়লো পানির খোঁজে কিন্তু কোথাও পেল না।অবশেষে সে একটা কলসী আবিষ্কার
করলো।কিন্তু দুর্ভাগ্য যে কলসীর তলদেশে ছিল একটু পানি।তা পান করা তার জন্য দুঃসাধ্য
হলে পড়লো।তারপর সে একটা বুদ্ধি করলো, পাশে ছিল নুড়িপাথরের স্তুপ আর সে একটা একটা করে
নুড়ি পাথর কলসীর ভেতর ফেললো এবং পানি খুব নিকটে এলে তা পান করে সে তার তৃষ্ণা মিটিয়ে
তৃপ্তি নিয়ে উড়ে গেল।এ গল্পে আমরা দেখেছি দুটো জিনিস তা হলো কাকের উপস্থিত বুদ্ধি আর
অদম্য চেষ্টা। বুদ্ধি আর চেষ্টার ফলে সে পরিশেষে সফল হয়।
কাক কালো,কোকিলও কালো।কিন্তু কাক আশ্রয়দাতা আর কোকিল কিন্তু বাউণ্ডুলে।কোকিলের ঘর নেই,নিজস্ব আশ্রয় নেই তবু কোকিলের বাচ্চা বেড়ে উঠে।ভাবছেন কীভাবে? ঐ যে বললাম কাক যেমন বুদ্ধিমান তেমনি বোকা।বোকা এই অর্থে যে উপকারী চিত্ত সকলের কাছেই বোকা হিসাবে বিবেচিত হয়।কোকিলের ঘর নেই তাই সে কাকের বাসায় তার ডিম পেড়ে যায়।কাক নিজের ডিম মনে করে তাতে তা দিয়ে বাচ্চা ফোঁটায়।
দেখতে একি রকম তাই কাক দয়া,মায়া, স্নেহ, অন্ন দিয়ে কোকিলের বাচ্চাকে বড় করে তোলে আর একটু বড় হলেই কোকিলের বাচ্চা দূর থেকে কোকিলের কুহু ডাক শুনে চলে যায়।কাক যে সেই দাত্রী যে বিনা পারিশ্রমে কোকিলের বাচ্চাকে বড় করে দেয়।তবু কাকের মন খারাপ নেই।মন বড় না হলে আজ বসন্তে আমরা কোকিলের ডাক শুনতে পারতাম না।প্রতিটি কোকিলের পিছনে আছে কুশ্রী, বিশ্রী কাকের অনুপম ভালোবাসা, শ্রম।আমাদের মানব সমাজেও এমন আছে যে কাকের মতো কোনো নিরীহ পাখির আশ্রয়ে থেকে বড় হয় আর তারপর বড় সমাজ নামক কোকিলের ডাক সব ভুলে চলে যায়।এতে দুঃখিত হলে হবে না কারণ এসব কাকরূপী সেরা কারিগর আছে বলেই কোকিল আছে নইলে সমাজ আর কোকিলের সংকটে পড়তো।কাক থেকে আমরা শিখতে পারি অনেক কিছু।কাক হতে পারে আমাদের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ।
কাক হলো আমাদের পরিবেশবান্ধব। কাক নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশে তার অস্তিত্ব টিকে রাখতে সক্ষম আর বাংলাদেশ হলো সেই নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল; সে সুবাদে আমরা শহরে,নগরে,গ্রামে,গাছের ডালে,বৈদ্যুতিক খুঁটিতে দেখতে পাই কাক আর কাকের অভয়ারণ্য।কাক পোকামাকড়, মৃত প্রাণি,ফল খেয়ে জীবন ধারণ করে।কাকের কাছে আমরা ঋণী কারণ কাক পরিচ্ছন্ন কর্মী হয়ে আমাদের চারপাশের আবর্জনা পরিষ্কার করে।কিন্তু আমরা মানব সমাজ আজও কি কোকিলের উপরে কাকের স্থান দিতে পেরেছি? না,পারি নি কারণ আমরা উপকারীর উপকার স্বীকার করি না।আমরা অকৃতজ্ঞ।
কবিরা
কবিতা লিখলো কোকিলকে নিয়ে।প্রিয়জন মনের সুধা
মিটালো কোকিলের গান শুনে।কিন্তু কোকিল কী দিল,কী করলো -তা ভাবি নি।কোকিল হলো বড় লোকের
আদরের সন্তান যে অকর্মা,বেয়াদব, স্বার্থপর তবু কোলে নিয়ে আদর করি,নিজেদের সর্বোচ্চ
দিয়ে তাকে খুশি করার চেষ্টা করি।অপর দিকে কাক হলো শ্রমিকের মতো যে তার ঘাম দিয়ে গড়ে
তুলবে আমাদের বাড়ি,ঘর,কলকারখানা,আধুনিক সভ্যতার সকল কিছু শ্রমিকের ঘামে ভেজা তবু ওরা
কদর পাবে না,সম্মান পাবে না; ওরা কাক হয়ে নিভৃত সবার উপর করে শুধু কোকিলের মতো সুললিত
কণ্ঠে সে ডাকতে পারে না,আধুনিক ভাষা জ্ঞান তার নেই,ভণিতার ভান করে সে কাউকে বলে না,'
কুহু' সে বলে ' কা!কা!'
এই কা কা তে কিছু অভিযোগ, কিছু অভিমান, কিছু ধিক্কার আছে যা আমরা বুঝি না।হয়তো কাক তার খসখসে গলায় বলে,' কা = কালের,কা= কাব্য আমরাই লেখি আর তোমরা কোকিলের মিথ্যা ডাকে তাদেরকে নিয়ে কাব্য লিখ? সংকটে আর উপকারে কাক আসে সবার আগে,কোকিল নয়। আমাদের সমাজ,রাষ্ট্র ও সাম্যের জন্য কোকিল নয় বরং কাকের দরকার।কাককে টিকিয়ে রাখতে,কাকের অস্তিত্ব বাঁচাতে আমাদের এখন কিছু করতে হবে নইলে বিশ্ব শ্রমিক দিবসে হয়তো কোনো বড় কর্তা তাঁর ড্রাইভারকে ফোন করে বলছে,
--কৈ রে,আজ আসিস নি কেন?
--স্যার
আজ মে দিবস,আজ তো বন্ধ।
--ছোটো লোকের বাচ্চা, বড় কর্তার ড্রাইভারের ছুটি হয়? এখনি চলে আয়, নইলে চাকরি যাবে,জীবনও যাবে।মে দিবসের আলোচনায় বক্তব্য দিতে হবে,তাড়াতাড়ি আয়।
হয়তো
সেই ড্রাইভার জীবন আর চাকরি বাঁচাতে শ্রমিক দিবস উপভোগ না করেই ছুটে আসলো। কাকের ছুটি
নেই,কাকের কাজের স্বীকৃতি নেই।শ্রমিকের মান ও মর্যাদা রক্ষার্থে হয়তো মন্ত্রী মহোদয়
বা বড় কর্তা অনেক বক্তব্য রাখলেন আর তখন দূরে বসে ড্রাইভার কাঁদছে আর মনে মনে বলছে
' এ যে শুভংকরের ফাঁকি।পাশে থেকে হয়তো কোনো কাক ' কা কা ' বলে সেই শ্রমিকের সাথে
সঙ্গতি প্রকাশ করছে কিন্তু সে কথা খবরে আসে নি।মহান
মে দিবস পালিত হয় তবে শ্রমিকের প্রাপ্তির খাতায় শূন্যতায় ভরে থাকে।কাক রূপি আমাদের
উপকারী আত্মা শ্রমিকের জীবন ও মানের কোনো পরিবর্তন হয় না।একদিন ছুটি,কিছু আলোচনা, কিছু
ভোজন আর কিছু পেপার হেডিং তবু শ্রমিকের প্রাপ্য;এখানে কাকের চেয়ে কিছুটা স্বস্তিতে
থাকে।আমরা পূর্ণ স্বস্তি ও মর্যাদা চাই,একদিনের দিবসে তিনশো পঁয়ষট্টি দিনের দুঃখ কভু
ঘুচবে না।
আকাশজমিন/আরআর