শিবগঞ্জ প্রতিনিধি / : 222
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
চলনবিলে
বিলুপ্তপ্রায় ৯০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ। আগে ১৩০ প্রজাতির মাছ পাওয়া গেলেও গত তিন
দশকে তা কমে ৪০ প্রজাতিতে নেমে এসেছে। স্থায়ীভাবে বিলুপ্ত হয়েছে ধোঁদা, গুড়পুঁই, বাছা,
ব্যাইটকা, গজার, শিলং, ভেদা, শংকর, ফাঁদা, পানি রুইয়ের মতো প্রায় ১১ প্রজাতির মাছ।
চলনবিল-সংশ্লিষ্ট
মৎস্য অফিসগুলোর দেওয়া তথ্যমতে, চলনবিল অঞ্চলে ১ হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল,
৪ হাজার ২৮৬ হেক্টর আয়তনবিশিষ্ট ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট ২২টি খালের
মিঠাপানিতে ১৩০ প্রজাতির মাছের বংশবিস্তার ছিল। প্রজনন মৌসুমে প্রজনন বাধাগ্রস্ত করে
নিষিদ্ধপন্থায় মা-মাছ শিকার এবং পোনা নিধন অব্যহত রাখায় ৯০ প্রজাতির মাছ আজ বিলুপ্তপ্রায়।
খুব
কম দেখা মিলছে মেনি, পুঁইয়া, চিতল, ফোলি, চিংড়ি, ভেদা, বেলে, পাবদা, কাঁচকি, চাঁদা,
মলাঢেলা, দাঁড়কিনা, বৌমা, ঘাড়ুয়া, ভাঙ্গন, কালিবাউশ, বাঁশপাতাসহ অন্তত ৪০ প্রজাতির
মাছের।
চলনবিল
নিয়ে লেখা বিভিন্ন প্রবন্ধে আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানী, গুড়, করতোয়া, বড়াল, তুলসী চেঁচিয়া,
ভাদাই, চিকনাই, বানগঙ্গা, নবীরহাজির জোলা, হকসাহেবের খাল, নিমাইচড়া খাল, বেশানীর খাল,
গুমানী খাল, উলিপুর খাল, সাঙ্গুয়া খাল, দোবিলা খাল, কিশোরখালির খাল, বেহুলারখাড়ি, বাকইখাড়া,
গোহালখাড়া, গাড়াবাড়ি খাল, কুমারভাঙ্গা খাল, জানিগাছার জোলা, সাত্তার সাহেবের খাল, কিনু
সরকারের ধরসহ অসংখ্য নদী-নালা ও খাল। তবে বর্তমানে
এসব জলাশয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। এসব উৎসেই প্রচুর পরিমাণে দেশীয় মাছের আনাগোনা ছিল।
চলনবিল
এলাকার বাসিন্দা তামিম, শফি, শাপিন, রমজানসহ অনেকেই জানান, একসময় বিলের উন্মুক্ত
জলরাশিতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন জেলেরা। তবে সময়ের বিবর্তনে মাছের সঙ্গে
বিলুপ্ত হয়েছে জেলেদের পেশাও। এখন বানের পানি এলেই শুরু হয় নিষিদ্ধ সব উপকরণ দিয়ে মাছ
শিকার। বিশেষ করে চায়না দুয়ারী জাল। যাদিয়ে
মাছের পোনা থেকে শুরু করে কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক পর্যন্ত নিধন হয়ে হয়। অথচ স্থানীয়
প্রশাসন মাছ রক্ষায় কার্যত তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয় না। এই কারণে চলনবিল এখন দেশীয়
প্রজাতির মাছ শূন্যের পথে।
সম্প্রতি
পলো উৎসবে বোঝা গেলে চলনবিল সত্যি মাছ শূন্যের পথে রয়েছে! রংপুর-গাইবান্ধা থেকে
শৌখিন শিকারিরা মাছ শিকারে চলনবিলে এসে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রাণপণ চেষ্টায় তিনটি
ছোট বোয়াল নিয়ে ফিরেছেন প্রায় দেড় হাজার শিকারি!
শৌখিন
শিকারিরা জানান, বর্ষায় কানায় কানায় পূর্ণ থাকে চলনবিল। প্রচুর পরিমাণে দেশীয় মাছের
দেখা মেলে। স্বাদেও অনন্য এই মাছ। এমন সব গল্প শুনে এসেছে দেশের বৃহৎ সেই বিলে মাছ
শিকার করতে, এসে হতাশ হয়েছেন তারা। দু-একজন ছোট বোয়াল, টাকি পেলেও বেশিরভাগ শিকারি
মাছ পাননি। এতে তারা রীতিমতো বিস্মিত।
সিরাজগঞ্জের
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাহিনুর রহমান মিঠাপানির দেশীয় মাছ সংরক্ষণে আশার কথা শোনালে,
তিনি বললেন, চলনবিলে অন্তত ১৪৭টির বেশি মৎস্যঘের রয়েছে। সময়মতো বানের পানি না আসায়
এসব ঘেরেও সুবিধা মিলছে না। তাছাড়া প্রজনন বাধাগ্রস্ত করে মাছ শিকার, খালবিল দখল-দূষণ,
ভরাট, অতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ এমন নানা কারণে চলনবিল থেকে দেশীয় প্রজাতির বহু মাছ
বিলুপ্তপ্রায়। দেশীয় এসব মাছ রক্ষায় সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর অঞ্চল নিয়ে একটি বিশেষ
প্রকল্প গ্রহণ করতে যাচ্ছেন তারা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে চলনবিলের বিলুপ্তপ্রায়
মাছগুলো আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে মাছ রক্ষায় মৎস্য প্রাণিসম্পদ এবং কৃষি বিভাগের
সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত মৎস্য কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, তাড়াশ উপজেলার চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। তাছাড়া বিভিন্ন বাজারে জনসাধারণকে সচেতন করতে লিফলেট বিতরণ, পথসভাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এ
বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, চলনবিলে পানি আসার
সাথে সাথেই ডিমওয়ালা বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ দেখা যাচ্ছে। কিছু অসাধু ব্যক্তি সেই
মাছগুলো নিধন করছে। মাছের প্রজনন মৌসুমে নিয়মিত প্রশাসনের অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রাকৃতিক
মাছের প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ করতে না পারলে চলনবিলে মাছ সংকট দেখা দিবে।
আকাশজমিন/আরআর