স্টাফ রিপোর্টার
বিদেশে
অবস্থিত বাংলাদেশি মিশনগুলো থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি
সরিয়ে ফেলার নির্দেশনা নিয়ে শুরু হয়েছে
দেশজুড়ে তুমুল আলোচনা। প্রশ্ন উঠছে—কেন হঠাৎ
এমন সিদ্ধান্ত? কার নির্দেশে? এবং
কী এর সাংবিধানিক বা
প্রশাসনিক ভিত্তি? এই ঘটনাকে কেন্দ্র
করে প্রশাসন, কূটনৈতিক মহল ও রাজনৈতিক
অঙ্গনে নানা বিশ্লেষণ শুরু
হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে রাষ্ট্রপতির ছবি সরিয়ে ফেলার একটি মৌখিক নির্দেশনা জারি করে। কোনো লিখিত প্রজ্ঞাপন বা সরকারি কাগজপত্র না থাকলেও কয়েকজন দূতের মাধ্যমে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয় বিভিন্ন মিশনপ্রধানদের কাছে। রোববার (১৮ আগস্ট) বিষয়টি সর্বসাধারণের নজরে আসার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সংবাদমাধ্যমে এটি আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
‘জিরো পোর্ট্রেট’ নীতির আওতায় এই সিদ্ধান্ত?
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সরকারের এক প্রভাবশালী উপদেষ্টা সম্প্রতি বিদেশ সফরের সময় একটি মিশনে রাষ্ট্রপতির ছবি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং প্রশ্ন তোলেন—এই ছবি এখনো কেন রয়েছে? এরপরই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে মৌখিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয় রাষ্ট্রপতির ছবি সরাতে। এই ঘটনার পরপরই কিছু মিশন থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি সরানো হয় এবং অন্যদের জানিয়ে দেওয়া হয় একই নির্দেশনা অনুসরণ করতে।
রবিবার রোহিঙ্গা বিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। একইভাবে মুখপাত্র শাহ আসিফ রহমানও বিষয়টি এড়িয়ে যান।
বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বিদেশি মিশনে বাধ্যতামূলকভাবে প্রদর্শন করতে হবে। তবে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী—এই দু’জনের ছবি টাঙানো বাধ্যতামূলক নয়।
২০০২ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি টাঙানোর রেওয়াজ চালু করেছিল। সে অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মিশনগুলোতে ছবি পাঠানো হতো, যেগুলো তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারিত হতো।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এরপর থেকেই তার ছবি টাঙানো থেকে বিরত থাকা হয়। এমনকি, সংবাদমাধ্যম বা সরকারি প্রচারণায়ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের ছবি নিষিদ্ধ করা হয়।
সেই ধারাবাহিকতায় শুরু হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও রাষ্ট্রপতির ছবি সরানোর প্রক্রিয়া। ইতোমধ্যেই ৭০টির বেশি মিশন থেকে সব ছবি সরিয়ে ফেলা হয়। নতুন নির্দেশনার পর বাকি মিশনগুলো থেকেও রাষ্ট্রপতির ছবি নামিয়ে ফেলা হয়েছে।
সাবেক কূটনীতিকদের প্রতিক্রিয়া
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘‘রাষ্ট্রপতির ছবি রাখা না রাখা পুরোপুরি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্ত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা নয়। যদি নতুন কোনো নিয়ম হয়, তবে তা লিখিত থাকা উচিত।’’
সরকারি দপ্তরে পোর্ট্রেট টাঙানো কোনো নতুন বিষয় নয়। কিন্তু হঠাৎ করে রাষ্ট্রপতির ছবি সরানোর ঘটনা একদিকে যেমন প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণে ব্যতিক্রমী, অন্যদিকে তা রাজনৈতিকভাবে নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত বা আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না আসায়, গুঞ্জন থামছে না। এটা কি শুধুই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, না এর গভীরে রয়েছে অন্য কোনো বার্তা—তা জানতে হলে হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
আকাশজমিন/আরআর