ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :

বিদেশি মিশনে রাষ্ট্রপতির ছবি সরানোর নির্দেশ: প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, না রাজনৈতিক বার্তা?


  • আপলোড সময় : সোমবার ১৮ আগস্ট, ২০২৫ সময় : ৩:৫৫ পিএম

স্টাফ রিপোর্টার

বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি মিশনগুলো থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি সরিয়ে ফেলার নির্দেশনা নিয়ে শুরু হয়েছে দেশজুড়ে তুমুল আলোচনা। প্রশ্ন উঠছেকেন হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত? কার নির্দেশে? এবং কী এর সাংবিধানিক বা প্রশাসনিক ভিত্তি? এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসন, কূটনৈতিক মহল রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।

 মৌখিক নির্দেশ, লিখিত প্রমাণ নেই

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে রাষ্ট্রপতির ছবি সরিয়ে ফেলার একটি মৌখিক নির্দেশনা জারি করে। কোনো লিখিত প্রজ্ঞাপন বা সরকারি কাগজপত্র না থাকলেও কয়েকজন দূতের মাধ্যমে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয় বিভিন্ন মিশনপ্রধানদের কাছে। রোববার (১৮ আগস্ট) বিষয়টি সর্বসাধারণের নজরে আসার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সংবাদমাধ্যমে এটি আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়।

জিরো পোর্ট্রেটনীতির আওতায় এই সিদ্ধান্ত?

 প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘‘সরকারি দপ্তরে পোর্ট্রেট ব্যবহার শুরু থেকেই অন্তর্বর্তী সরকার নিরুৎসাহিত করছে। অলিখিতভাবেজিরো পোর্ট্রেটনীতি বজায় রেখেছে। তারপরও কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে রাষ্ট্রপতি কিংবা সরকারের প্রধানের ছবি ব্যবহার করেছেন।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘কাউকে ছবি সরিয়ে ফেলতে লিখিত কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তারপরও এটি নিয়ে অযথা আলোচনা তৈরি করা হচ্ছে।’’

 এক উপদেষ্টার সফর ঘিরেই কি পুরো ঘটনা?

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সরকারের এক প্রভাবশালী উপদেষ্টা সম্প্রতি বিদেশ সফরের সময় একটি মিশনে রাষ্ট্রপতির ছবি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং প্রশ্ন তোলেনএই ছবি এখনো কেন রয়েছে? এরপরই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে মৌখিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয় রাষ্ট্রপতির ছবি সরাতে। এই ঘটনার পরপরই কিছু মিশন থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি সরানো হয় এবং অন্যদের জানিয়ে দেওয়া হয় একই নির্দেশনা অনুসরণ করতে।

 পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরনীরবতা

রবিবার রোহিঙ্গা বিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের বৈঠকের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম। তবে তিনি বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। একইভাবে মুখপাত্র শাহ আসিফ রহমানও বিষয়টি এড়িয়ে যান।

 রাষ্ট্রপতির ছবি সরানো নির্বাচন সংশ্লিষ্ট নয়: উপদেষ্টা রিজওয়ানা

 পরিবেশ, বন জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘‘আমি বিষয়টি পত্রিকায় পড়েছি। যেহেতু আমি কোনো বিদেশি দূতাবাসে কাজ করি না, তাই বিস্তারিত বলতে পারছি না। তবে এটা নিশ্চিত, এর সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। একটা ছবির সঙ্গে নির্বাচনের সম্পর্ক থাকতে পারে না।’’ তিনি আরও বলেন, যদি এটি সরকারি সিদ্ধান্ত হয়, তাহলে অবশ্যই লিখিত প্রমাণ থাকার কথা। উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা না হলে বিষয়টি পরিষ্কার নয়।

 সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ছবি টাঙানো

বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বিদেশি মিশনে বাধ্যতামূলকভাবে প্রদর্শন করতে হবে। তবে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীএই দুজনের ছবি টাঙানো বাধ্যতামূলক নয়।

২০০২ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর ছবি টাঙানোর রেওয়াজ চালু করেছিল। সে অনুযায়ী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মিশনগুলোতে ছবি পাঠানো হতো, যেগুলো তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারিত হতো।

  আগস্টের পরছবি সরানো ধারাবাহিকতা

২০২৪ সালের আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন . মুহাম্মদ ইউনূস। এরপর থেকেই তার ছবি টাঙানো থেকে বিরত থাকা হয়। এমনকি, সংবাদমাধ্যম বা সরকারি প্রচারণায়ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের ছবি নিষিদ্ধ করা হয়।

সেই ধারাবাহিকতায় শুরু হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির ছবি সরানোর প্রক্রিয়া। ইতোমধ্যেই ৭০টির বেশি মিশন থেকে সব ছবি সরিয়ে ফেলা হয়। নতুন নির্দেশনার পর বাকি মিশনগুলো থেকেও রাষ্ট্রপতির ছবি নামিয়ে ফেলা হয়েছে।

সাবেক কূটনীতিকদের প্রতিক্রিয়া

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘‘রাষ্ট্রপতির ছবি রাখা না রাখা পুরোপুরি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্ত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা নয়। যদি নতুন কোনো নিয়ম হয়, তবে তা লিখিত থাকা উচিত।’’

 তিনি আরও বলেন, *‘‘আগে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে অফিসিয়াল ছবি নির্বাচন করে তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সব মিশনে পাঠানো হতো। এটি ছিল একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। এখন যদি শুধু বিদেশি মিশন থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে সেটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।’’

 প্রশ্ন অনেক, উত্তর অজানা

সরকারি দপ্তরে পোর্ট্রেট টাঙানো কোনো নতুন বিষয় নয়। কিন্তু হঠাৎ করে রাষ্ট্রপতির ছবি সরানোর ঘটনা একদিকে যেমন প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণে ব্যতিক্রমী, অন্যদিকে তা রাজনৈতিকভাবে নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত বা আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না আসায়, গুঞ্জন থামছে না। এটা কি শুধুই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, না এর গভীরে রয়েছে অন্য কোনো বার্তাতা জানতে হলে হয়তো আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

আকাশজমিন/আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর